পুলিশী বর্বরতা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ঢুকে নিরস্ত্র ছাত্রছাত্রীদের ওপর অকথ্য অত্যাচার – এ সবেরই সাক্ষী হয়ে রইল রাজ্য তথা দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়।

গত আঠাশে আগস্ট, রাত ৮ টায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শেষে ক্যাম্পাসের মধ্যেই নির্যাতনের শিকার হন কলাবিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের এক ছাত্রী। বয়েজ হস্টেলের ৬-৭ জন ছাত্র তাঁর শ্লীলতাহানি ও মারধর করে বলে অভিযোগ। থানায় অভিযোগের পর লিখিত ভাবে উপাচার্যের কাছেও অভিযোগ জানান নিগৃহীত ছাত্রীর বাবা ।উপাচার্য তাকে দুদিন পরে দেখা করতে বলেন।

উপাচার্যের এই আচরণের প্রতিবাদে সরব হন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা।অভিযোগ ওঠে, শ্লীলতাহানির মতো গুরুতর অভিযোগকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছেন উপাচার্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটির ভূমিকা নিয়েও তারা প্রশ্ন তোলে। দাবি ওঠে পুরনো কমিটি ভেঙে নতুন তদন্ত কমিটি গঠনের।

মঙ্গলবার গভীর রাতে এই আন্দোলনকারী ছাত্রছাত্রীদের ওপর আচমকা শুরু হয় পুলিশ ও কিছু বহিরাগতদের বর্বরোচিত অত্যাচার।

আন্দোলন রুখতে মঙ্গলবার মধ্যরাতে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে আচমকা পুলিশ ডাকেন উপাচার্য। ক্যাম্পাসের আলো নিভিয়ে নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের ওপর ছাত্রছাত্রী নির্বিশেষে চলে অবাধে প্রহার, যার কিছুটা ধরা পরে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের ক্যামেরায়।বেশ কিছু ছাত্রছাত্রী গুরুতর ভাবে আহত হন। প্রহৃত ছাত্রছাত্রী দের অভিযোগ, পুলিশ ছাড়াও কিছু বহিরাগত ব্যক্তি, যারা পুলিশি পোশাকে ছিলেন না, তাদের ওপর চড়াও হয় এবং মারধোর করে। আপাতভাবে ‘গেঞ্জি পুলিশ’ নামে অভিহিত ঐ আক্রমণকারীদের সঠিক পরিচয় জানা যায়নি।

ঘটনার প্রতিবাদে আজ সকাল থেকেই সরব হন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা। দফায় দফায় চলতে থাকে যাদবপুর থানার সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন। এদিন বিকেলে এক বিশাল বিক্ষোভ মিছিল বের হয় বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর থেকে। ছাত্রছাত্রীদের সাথে এই বর্বরোচিত আচরণের প্রতিবাদে, উপাচার্যের পদত্যাগ দাবী করা হয়। অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস বয়কটের ও ডাক দেন তারা। আন্দোলনকারীদের সাথে পা মেলাতে দেখা যায় কৌশিক সেন, সমীর আইচ প্রমুখ বিদ্বজ্জনদের। ছাত্রছাত্রীদের সাথে আলোচনায় না বসে, বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে সরাসরি পুলিশ ডাকার, উপাচার্যের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করা হয়। আগামীকাল ছাত্র ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে কিছু বামপন্থী ছাত্র সংগঠন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য শ্রী অভিজিৎ চক্রবর্তী সংবাদমাধ্যমের কাছে ঘটনার সত্যতা অস্বীকার করেন। তার অভিযোগ ছাত্রছাত্রীরাই নাকি পুলিশের সাথে মারামারি করেছে। শিক্ষামন্ত্রী শ্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় উপাচার্যের কাছে পু্রো ঘটনার রিপোর্ট চেয়ে পাঠিয়েছেন।

হ্যাঁ, এই ঘটনা সময় আমি সামনে ছিলাম না। আমি এখন ছাত্র নই, যাদবপুরের ছাত্রও কোনদিন ছিলাম না। তাহলে এত কথা বলছি কেন? আমি তো কূপমন্ডুক। যখন এই ঘটনা ঘটছে তখন তো আমি নিশ্চিন্তে আমার বাড়িতে, নিরাপদ আশ্রয়ে। তবু এই ঘটনার কথা শুনে, বন্ধু বান্ধবদের কথা শুনে মনে হয়েছিল যেন আমি যাদবপুরেই আছি। রাষ্ট্র তো শাসন করবেই, আর সেই শাসনকের তোয়াক্কা না করে ছাত্ররা মাথা তুলবেই। মনে মনে আমিও কূপমন্ডূকের খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলাম। গোটা বাংলার ইতিহাসেই আরও একটা কালো দিন আমরা দেখলাম – কিন্তু এটা কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় – বরং যে বিচ্ছিন্নতাকে সঙ্গে নিয়ে আমরা চলেছি, তার আরও একটা জলজ্যান্ত নিদর্শন। আমাদের বিপ্লব নিরন্তর – আপনারা কাছে থাকুন বা দূরে, যাদবপুরের সঙ্গে থাকুন। থাকবেন তো?

Latest posts by কূপমন্ডুক (see all)