এই পৃথিবীতে অগুনতি প্রজাতির পাখি পাওয়া যায়। তাদের কারোর বর্ণের সম্ভার চোখ জুড়িয়ে দেওয়ার মতো, কারো কণ্ঠের গান মন মাতিয়ে দেয়। কিন্তু আজ যে দুটি পাখির সম্পর্কে এখানে জানব তারা রঙের দিক থেকে নেহাতই সাদামাটা। কিন্তু এদেরও কিছু বিশেষত্ব আছে। আসলে এই পৃথিবীর প্রত্যেকটি জীবেরই কিছু নিজস্ব গুণ আছে। তারা কেউ বা অতি ছোটো আবার কেউ পরিচিত সুবিশাল আকৃতির জন্য। আইবিস (Ibis) পেলিক্যানিফর্মিস (Pelecaniformes) বর্গের অন্তর্ভুক্ত থ্রেসকিওর্নিথিডি (Threskiornithidae) গোষ্ঠীর পাখি। এদের চেনার সব থেকে ভালো উপায় হল এদের চঞ্চু, ঠিক যেন কাস্তের মতো বাঁকানো আর পা গুলোও বেশ বড় বড় শামুক-খোলদের মতো। ভারতে তিন ধরণের আইবিস যথা Oriental White Ibis (Threskiornis melanocephalus), Black Ibis (Pseudibis papillosa) এবং Glossy Ibis (Plegadis falcinellus) দেখতে পাওয়া যায়। তবে আজকের আলোচনা থাকছে White Ibis এবং Black Ibis প্রসঙ্গে, যাদেরকে পশ্চিমবঙ্গের মাঠ ঘাটে এবং খোলা ধানক্ষেত গুলিতে সহজে দেখা যায়।

White Ibis (Sada Kastecera)

প্রথমেই আসব সাদা আইবিস বা কাস্তেচেরা বা সাদা দোচরা প্রসঙ্গে। Oriental White Ibis কে Black-headed Ibis ও বলা হয়ে থাকে, এদের বিজ্ঞান সন্মত নাম Threskiornis melanocephalus আর বাংলা নাম কাস্তেচেরা বা সাদা দোচরা। এদের খোলা মাঠে একসাথে জোট বেঁধে খাবারের খোজ করতে দেখা যায় শামুক-খোল বা Asian Openbill-Stork দের সাথে। আমি বর্ধমান যাওয়ার পথে বা বর্ধমান থেকে কালনা বা কাটোয়া যাওয়ার মূল রাস্তার পাশে এদের জোট বেঁধে ঘুরে বেড়াতে দেখেছি বেশ কয়েকবার। এদের গায়ের রঙ ধবধবে সাদা যদিও ন্যাড়া মাথা, গলা ও পায়ের রঙ কালো। আকারে মোটামুটি ৭৫ সে.মি. মতো হয় এবং পা গুলি যথেষ্ট লম্বা ও শক্তপোক্ত হয়। এদের ঠোঁট শক্ত কালো এবং কাস্তের মতো সামনের দিকে বাঁকানো। এরা খুব দ্রুত এবং সোজা ভাবে উড়তে পারে। গলায় স্বর উৎপাদনকারী পেশীর অভাব থাকায় বেশী জোরে ডাকতে পারেনা, কেবল মাত্র প্রজনন কালে এবং সীমা নির্ধারণের জন্য মৃদু শব্দ বের করে। প্রজনন কালে ঘাড়ে ও ডানার কাছে ধূসর রঙের আভা দেখা যায় এবং গলার নিচের অংশে বাহারি পালক গজায়। এরা জল জমা ধান মাঠের মধ্যে থেকে শামুক, ছোটো মাছ, ব্যাঙ এবং ছোটো বড় পোকামাকড় ধরে সংগ্রহ করে। এরা বেশ সামাজিক পাখি, শামুক-খোলদের মতো কলোনি তৈরি করে গাছের ওপরে বাসা করে এবং প্রজনন ঋতুতে ২-৪টি ডিম পাড়ে।

Black Ibis (Kalo Kastecera)

সাদা আইবিসের মতোই কালো আইবিসেরও অনেক নাম। Indian Black Ibis বা শুধু Black Ibis ছাড়াও আরেকটি নাম হল Red-napped Ibis, এদের বিজ্ঞান সন্মত নাম Pseudibis papillosa আর বাংলা নাম কালো কাস্তেচেরা বা কালো দোচরা। বর্ধমান জেলার অন্ডালের ফাঁকা মাঠ থেকে ১০ই আগস্ট ২০১৩ তারিখে প্রথম এই পাখিটির সন্ধান পাই এবং ছবি তুলতে সক্ষম হই। আকারে ও দৈহিক গঠন সাদা আইবিসের মতোই হয় তবে দেহের রঙের পার্থক্য লক্ষণীয়, যা থেকে খুব সহজে পার্থক্য করা যায়। এদের গায়ের রঙ ঘন কালো তবে কাঁধের কাছে সাদা রঙের বড় ছোপ দেখা যায়। কালো রঙের ন্যাড়া মাথার ঠিক ওপরে লাল রঙের ত্রিকোণাকার ছোপটি দেখে দূর থেকে এদের চেনা যায়। বাঁকানো চঞ্চুটির রঙ হলদেটে ধরণের হয় আর পায়ের রঙ পোড়া ইঁটের মতো। ধান জমির পাশের খোলা শুষ্ক জমিতে এদের একসাথে দল বেঁধে বা একা একা থাকতে দেখা যায়। অন্যান্য আইবিসদের বিপরীতে এরা জলা জায়গার পরিবর্তে শুকনো খোলা মাঠে থাকতে বেশী পছন্দ করে। এছাড়াও এরা সাদা আইবিসদের মতো অন্য জাতের পাখিদের সাথে বাসা বাঁধে না, বরং নিজেদের দু-তিনটি দল বাসা বেঁধে থাকে। গাছের ওপর বড় বাটির মতো আকারের বাসা বানায় তবে শকুন বা ঈগলের পরিত্যক্ত বাসাতেও থাকতে দেখা যায়। প্রজনন কালে ২-৮টি ডিম পাড়ে। এরাও সচরাচর উঁচু স্বরে ডাকেনা তবে কখনো কখনো ওড়ার সময় নাকিস্বরে চিৎকার করে। সাদা আইবিসদের মতো এরাও দ্রুত এবং অনেক উঁচুতে উড়তে পারে। এদের খাদ্যাভাসে আছে শস্যদানা, ছোটো পোকা, ছোটো সাপ, গিরগিটি ধরণের জীব। যদিও এরা পশ্চিমবঙ্গে বেশ ভালো সংখ্যায় আছে তবু দিন দিন চাষের জমি ও খোলা জমির পরিমাণ কমে আসার জন্য চিন্তার কারণ দাঁড়িয়েছে। আশাকরি এদের আমরা শকুনের মতো হারিয়ে ফেলব না!

অমর নায়ক

অমর নায়ক

অমর পেশায় শিক্ষক, থাকেন অন্ডাল বর্ধমান। শখ বলতে বই পড়া ও দুর্লভ বই সংগ্রহ করা। অমর সেই মুষ্টিমেয় মানুষদের একজন যারা পরিবেশটাকে খুব কাছ থেকে চিনেছেন, ভালোবেসেছেন আর শিল্পায়নের জেরে বা মানুষের লোভে যে জীব বৈচিত্র ক্রমাগর পরিবেশ থেকে হারিয়ে যেতে চলেছে তার বিরুদ্ধে একা লড়ছেন। ‘ও কলকাতা’র মঞ্চে অমরকে পাওয়া খুব বড় পাওয়া। আমরা চাই তাঁর প্রতিবাদের ভাষা শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে, তাঁর লড়াইতে শামিল হতে।
অমর নায়ক