আগের পর্ব


গল্প অনুযায়ী, সর্বোপরি চিত্রনাট্য অনুযায়ী স্বাভাবিকভাবেই প্রথম দৃশ্যের পর দ্বিতীয় দৃশ্য, তারপর তৃতীয় দৃশ্য এভাবে পরপর সাজাতে হয়। এই সাজানোর পদ্ধতিকে বলা হয় সম্পাদনা, অর্থাৎ এডিটিং। চিত্রনাট্য যেমন ভেঙে যায় বিভিন্ন দৃশ্যে, ক্যামেরায় ধারন করা সেই দৃশ্যগুলি তেমনি ভেঙে যায় বিভিন্ন শট’এ। ছবিটি পূর্ণ রূপ পেলে দৃশ্যের আর কোনও অস্তিত্ব থাকেনা, সেটি হয়ে যায় অনেক অনেক শট’এর সমষ্টি।

ধরা যাক, একটি দৃশ্য আছে, এমন –

আঘোর নামের একটি যুবক বাঁশ বাগানের পাশ দিয়ে ছুটতে ছুটতে আসছে। সে কিছু দূরে অমিয়কে দেখতে পায়, ডাকে। আমিয় নামের কিশোরটি কাঁধে ছিপ নিয়ে মাছ ধরতে যাচ্ছিল, অঘোরের ডাক শুনে ঘুরে তাকায়, দাঁড়িয়ে পড়ে। অঘোর অমিয়র কাছে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলে, অমি তোর পরীক্ষার ফল বেরিয়েছে।

দেখুন কেমন করে এটিকে চলচ্চিত্রে দৃশ্যায়িত করছি।

১। দূর থেকে দেখছি, বাঁশ বাগানের পাশ দিয়ে অঘোর ছুটে আসছে। লক্ষ্য করুন প্রথমেই বললাম, দূর থেকে দেখছি। এই দেখাটাই ক্যামেরার দেখা, দর্শকের দেখা। দূর থেকে দেখছি, অতএব এটিকে লং শট বলব। পরিচালকের দৃষ্টিভঙ্গী বা ডিরেক্টরস পয়েন্ট অফ ভিউ বলেও একটা ব্যাপার আছে, কোনও কোনও শট সেভাবেও নেওয়া হয়, সেই তাত্ত্বিকতায় এক্ষুণি ঢুকছি না। সব ছবিটাই তো পরিচালকই দেখছেন। এই শটটি যদি মনে হয় দূরত্ব বোঝানোর জন্য কোনও উঁচু বাড়ির ছাদ থেকে নেওয়া প্রয়োজন, নেওয়া যেতে পারে। সেক্ষেত্রে এটিকে টপ লং শট বলা হবে। যাই হোক এটি হ’ল আমাদের প্রথম শট।

২। এবার অঘোরকে ছুটে আসতে দেখছি, কিন্তু অনেকটা কাছ থেকে। একে বলব মিড লং শট। এই যে দূর থেকে দেখা, কাছ থেকে দেখা, এর প্রতিটিরই কার্যকারণ থাকে। সে অনুযায়ী শট ভাগ করেন পরিচালক মশাই। পৃথিবীর সব কিছুর মত, এখানেও ব্যাতিক্রম বর্তমান। তার কথা এখন থাক। প্রথমে সোজা রাস্তাতেই এগোনো ভালো। যাই হোক দূর থেকে দেখা শট’এ অঘোরের মুখের ভাব বুঝতে পারছিলাম না, দরকারও ছিল না। কিন্তু দরকার পড়ায় আমরা ওকে কাছ থেকে দেখছি। কি দেখলাম? দেখলাম, অঘোর ছুটতে ছুটতে কিছু দেখতে পেয়েছে, ওর চোখ মুখের ভাবে তা প্রকাশ পেল, হাসিও ফুটল মুখে, ও চেঁচিয়ে ডাকল, অমি – । এটি হ’ল আমাদের দ্বিতীয় শট।

৩। এবার দেখলাম, মোটামুটি কাছ থেকেই। একটি কিশোর, যার নাম অমিয়, সে কাঁধে একটা ছিপ ফেলে আমাদের থেকে দূরে চলে যাচ্ছে। অর্থাৎ আমরা তাকে তার পেছন থেকে দেখছি। সে অঘোরের ডাক শুনতে পায়, থমকে দাঁড়িয়ে ঘাড় ঘোরায়। এটি আমাদের তৃতীয় শট।

৪। চতুর্থ শট’এ দেখি, অঘোর অনেকটা এগিয়ে এসেছে।

৫। পঞ্চম শট’এ অমিয়কে দেখি, সে এখন পুরোপুরি এদিকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। সেই ফ্রেমেই অঘোর ছুটতে ছুটতে ঢোকে। হাঁফাতে হাঁফাতে বলে, তোর পরীক্ষার ফল বেরিয়েছে। অমিয় ছিপটা মাটিতে ফেলে দিয়ে অঘোর যে দিক দেয়ে এসেছিল, সেদিকে ফ্রেমের বাইরে চলে যায়।

৬। ষষ্ঠ শট ঠিক চতুর্থ শট’এর মত, কেবল অমিয় দৌড়ে দূরে চলে যাচ্ছে।

৭। সপ্তম শট, অঘোর হাঁপাচ্ছে, অমিয়র চলে যাবার দিকে তাকিয়ে।

৮। অষ্টম শট, সেই দ্বিতীয় শট’এর মত, যেখানে অঘোরকে কিছুটা কাছ থেকে দেখেছিলাম, অমিয় দৌড়ে আমাদের থেকে দূরে চলে যাচ্ছে।

৯। নবম শট, সপ্তম শট’এর মত, কেবল এখানে অঘোর তার কোমরে বাঁধা গামছাটা খুলে ঘর্মাক্ত মুখটা মুছতে মুছতে অমিয়র চলে যাওয়া দেখছে।

১০। দশম শট, সেই প্রথম শট এর মত, দূর থেকে দেখা বা কোনও বাড়ির ছাদের ওপর থেকে দেখা, বাঁশবন, তারপাশ দিয়ে অমিয় দৌড়ে অঘোর যেদিক থেকে এসেছিল, সেদিকে চলে যাচ্ছে।

এই বার এই শটগুলি চিত্রগ্রহনের সময় যা করা হয়, তা হ’ল, প্রথম শট ও দশম শট একই সঙ্গে নেওয়া হয়। কারণ, ক্যামেরার অবস্থান, সময়, একই। প্রথমে গ্রহন করা হবে, অঘোর দৌড়ে আসছে। পরে গ্রহন করা হবে, অমিয় দৌড়ে চলে যাচ্ছে।

ঠিক একইভাবে, পাঠক খেয়াল করুন, যে যে শট’এর মিল আছে, সেগুলি একই সঙ্গে গ্রহন করা হবে। অর্থাৎ একই ফ্রেমে অঘোরের আসা আর অমিয়র যাওয়া।

এত কিছু বললাম, একটাই কারণে, সেটা হল, দৃশ্য গ্রহন কিন্তু চিত্রনাট্যের ক্রম সংখ্যা অনুযায়ী হয়না। এলোমেলো হয়। সম্পাদক সেগুলি সাজান। সে সাজানোর একটি পদ্ধতি আছে। এই দশটি শট কিন্তু বিশ, তিরিশ, চল্লিশটি শটেও রূপান্তরিত হয়ে যেতে পারে। ঘটনার ঘাত প্রতিঘাত অনুযায়ী তা করা হয়। সম্পাদনাকে দ্বিতীয় পরিচালনাও বলা হয়, সে কারণে।

সম্পাদক তো পর পর শট সাজাবেন। কিন্তু তাদের চিনবেন কি করে? তাই তাদের প্রত্যেকের একটি নাম দেওয়া হয়, অর্থাৎ নম্বর দেওয়া হয়। সেগুলি ক্ল্যাপ বোর্ডের মাধ্যমে শটের প্রথমেই ঢুকিয়ে রাখা হয়। যা দেখে সম্পাদক শটটিকে চিনতে পারেন। ধরুন উপরে উল্লেখিত দৃশ্যটি ছিল চিত্রনাট্যের ২৩ তম দৃশ্য। তবে আমরা শট’এর নামকরণ করব, এইভাবে, ২৩/১, ২৩/২ ইত্যাদি।

এই ক্ল্যাপ বোর্ডের কথা আমি পরবর্ত্তী কোনও অধ্যায়ে বিস্তারিত বলতে চাই। আজ এই টুকুই।


পরের পর্ব