বেকবাগান থেকে দুটো ছেলে নাগাড়ে ছুটে চলেছে। সে এক চিত্তির, একজন অপরজনকে তাড়া করছে। আজই ঘণ্টা আষ্টেক আগে সকাল ন’টার সময় শান্তনু ইন্টারভিউ দিতে আসার জন্য যখন বাড়ি থেকে বেরোচ্ছিল তখনও কি ও ভাবতে পেরেছিল আজ সন্ধ্যেয় ওর বয়সী আর পাঁচটা চাকুরে ছেলে যখন বান্ধবীকে নিয়ে ছবি দেখতে যাচ্ছে, বেকার ছেলেগুলো আরও সাড়ে বারো টাকা বাকি রেখে পাড়ার দোকান থেকে সিগারেট কিনছে, ওর পাড়ার ছেলেরা ফুটপাথে গাছের ডালে বাল্ব ঝুলিয়ে ক্যারম বোর্ড পেতে ওর জন্য অপেক্ষা করছে তখন শ্রীমান শান্তনু লাহিড়ী দক্ষিণ কলকাতার ব্যস্ত রাস্তায় পকেটমার ধাওয়া করছেন। ও ইশারায় রাস্তায় অন্যদেরকে বলছে ওই ছেলেটাকে থামানোর জন্য, চেঁচিয়ে বলছে ‘ও মশাই ছেলেটাকে ধরুন, ও ব্যাটা পকেটমার’। নিন্দুকেরা যাই বলুক, কলকাতার মানুষ এখন অনেক পালটে গেছে, অত হুজুগে নেই। এখন ওই গণধোলাই কালচারটা আর নেই।। কোন লোক যদিও বা টের পায় তার পকেট কাটা গেছে আর পকেটমার তার নাগাল থেকে চম্পট দিচ্ছে সে খুব বেশী টেনশন খায় না। গড়পড়তা শহুরে মানুষ এখন সাথে বেশী ক্যাশ রাখে না, বড়জোর পাঁচশো টাকা, বাকিটা কার্ড। ওই ছুটে চোর ধরার থেকে কার্ড কোম্পানি বা ব্যাঙ্ককে জানিয়ে দিলেই কার্ড ব্লক্‌ড, চোর কিছু সুবিধা করতে পারবেনা।

 কাঁধের ব্যাগটাকে ম্যানেজ করতে গিয়ে একটু অসুবিধায় পড়ছে শান্তনু, ওটার জন্য ঠিক করে দৌড়তে পারছেনা, ওতে অনেক দরকারি জিনিসপত্র রয়েছে তাই ছুঁড়ে ফেলে দিতেও পারছেনা। ওর ওয়ালেটে থাকার মধ্যে মাত্র তেইশ টাকা ছিল, আর ওর বাড়িও আহামরি দূরে নয়। একটা ট্যাক্সি ধরে বাড়ি ফিরে ভাড়া মিটিয়ে দিলেই হয়। তাছাড়া ওর ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই, পাসপোর্ট নেই, প্যান কার্ড আছে সেটা বাড়িতে। অর্থাৎ কোন দরকারি নথিও কিছু ছিল না ওর মানিব্যাগে যে এভাবে কোন কিছু তোয়াক্কা না করে একটা ক্রিমিনালকে ধাওয়া করতে হবে, আর কিছু নাহোক ওর কোনও ক্ষতি ছেলেটা তো করতেই পারে, ওর কাছে অস্ত্রও তো থাকতে পারে। ওরা এখন খুব অরগ্যানাইজ্‌ড, ওদের নির্দিষ্ট অপারেটিং জোন থাকে, কেউ মুশকিলে পড়লে ব্যাকআপ করার জন্য ধারেকাছে ওদের লোকজন সাধারণ মানুষের ভিড়ে মিশে থাকে। শান্তনু সম্ভাব্য বিপদের কথাটা ভাবতেই পারছেনা, ওর মাথাতেই আসছেনা।

ব্যাপারটা আসলে অন্য জায়গায়, ও জিনিসটাকে পার্সোনালি নিয়ে ফেলেছে, ও এটা মানতে রাজি নয়, যে ছেলেটা ওর পকেট মেরেছে সে তার পেশার তাগিদে করেছে, শান্তনুর জায়গায় ওর পাশের বাড়ির তারক সান্যাল হলেও ছেলেটার কিছু যেত-আসত না, বরং আরও অন্তত কুড়ি গুণ বেশী টাকা পাবার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু শান্তনুর রোখ চেপে গেছে, ছেলেটার হিম্মত হল কি করে? ও আর হারতে চায় না, ঢের হয়েছে। যে কেউ তার যা খুশি ওর উপর দিয়ে চালিয়ে যাবে এটা হতে দেওয়া চলে না।। তাকে ও ধরবেই আর উচিৎ শিক্ষা দেবে।

ওরা চোর-পুলিশ খেলুক। আমরা ততক্ষণ কয়েক ঘণ্টা পিছিয়ে যাই, শান্তনুর সাথে একটু পরিচয় করি। জানার চেষ্টা করি সকাল ন’টা থেকে শান্তনু লাহিড়ীর সাথে কী কী ঘটনা ঘটেছে আর এখন যা হচ্ছে তার আগা-মাথা কী।

শান্তনুর মনে হচ্ছে ওর কানে তালা লেগে গেছে। না, তাও ঠিক নয়। তা হলে তো কানে একটা একটানা চিন্‌ চিন্‌ শব্দ লেগে থাকবে, তা তো হচ্ছে না। তাছাড়া ও তো হাওয়ার শব্দ পাচ্ছে, নিজের কথাবার্তা শুনতে পাচ্ছে, খালি চারপাশের কিছু শব্দ ওর কানে আসছে না। যেমন লোকের অস্পষ্ট কথাবার্তা, এইমাত্র পাশ দিয়ে দুটো বাইক চলে গেল সেটার শব্দও ও পেলো না। অবশ্য এটা নিয়ে খুব বেশী বিচলিত ও নয়, ওর আজ অসম্ভব ভালো লাগছে। তালসারিতে এর আগেও বহুবার এসেছে কিন্তু তোতার সাথে এই প্রথম বার এসেছে ও। আর এত সুন্দর আবহাওয়াও আগে পায়নি এখানে। এই মে মাসের শেষাশেষি এসেছে অন্য সময় যখন এখানে প্রবল গরম থাকে আর উপকূলের এলাকা বলে প্যাচপ্যাচে ভাবটা অত্যন্ত বেশী যেটা সবচেয়ে বেশী কষ্ট দেয়। কিন্তু আজ একদম অন্যরকম। আজ এখানে কী সুন্দর ঠাণ্ডা হাওয়া দিচ্ছে, কলকাতায় কালবৈশাখীর ঠিক আগে এইরকম হাওয়া দেয়। ঠিক এইরকম মৃদু ঠাণ্ডা হাওয়া দিতে দিতে ঝুপ করে ঝোড়ো হাওয়া বওয়া শুরু হয়ে যায়। আজ একদম অন্যরকম। তোতাকেও আজ কী অপূর্ব লাগছে, একটা ময়ূর-নীল শাড়ী আর একটা ক্রিমসন লাল রঙের ব্লাউজ্‌, অথচ কী অদ্ভুত, একদম বেমানান লাগছে না, দিব্যি দেখাচ্ছে। তোতা যাই করে তাই সুন্দর, তোতা বলেই সম্ভব অথবা তোতার কোনকিছুই শান্তনুর মন্দ লাগে না, এও একটা কারণ হতে পারে। তোতার খোলা চুল উড়ছে, শাড়ীর আঁচলটা এমন ভাবে উড়ছে যেন ওর ডানা, ডানা ঝাপটিয়ে এক্ষুণি উড়ে যাবে ওর নিজের দেশে। এখানে যেন ও ভুল করে এসে পড়েছে কিন্তু এটা ওর পৃথিবী নয়, এখানে ও বেশীক্ষণ নিরাপদে থাকতে পারবে না। শান্তনু হামেশাই ওর ভাগ্যকে দোষ দেয় কিন্তু এখন ওর মনে হল এমন সুন্দর একটা মানুষ ওকে ভালোবাসে। বাংলায় ওর বয়সী প্রায় দেড় কোটি পুরুষের মধ্যে ওই একমাত্র ভাগ্যবান যার জন্য তোতার সমস্ত আদর ভালোবাসা, ওতে কেবল ওর একার অধিকার, ওর মত কপালে পুরুষ পৃথিবীতে বিরল।

তোতা কি যেন বলছে শান্তনুকে কিন্তু ও শুনতে পারছে না। এবার আরেকটা জিনিস খেয়াল হল ওর। ওর চারিদিকে সবকিছু যেন স্লো মোশনে চলছে, যশ চোপড়ার ছবিতে গানের সময় যেরকম হয়, নায়িকা যেরকমভাবে নায়কের দিকে দৌড়ে যায় বা তার উল্টোটা। তোতার চুলগুলো আস্তে উড়ছে, ও আস্তে আস্তে মুখের সামনে থেকে চুলগুলোকে ধরে কানের পেছনে ঠেলে দিচ্ছে। শান্তনু দেখেছে, ভিডিও এডিটিং-এর অনেক সফ্‌ট্‌ওয়্যার আছে সেখানে কোন ভিডিও চালিয়ে ফ্রেম রেট কমিয়ে দিলে এরকম দেখা যায়। তোতা শাড়ীটা কিছুতেই বাগে আনতে পারছে না, ওর বুকের ডানদিক থেকে বারবার আঁচলটা সরে যাচ্ছে, ব্লাউজের উপরে ওর বুকের কাছটা দেখতে খুব সুন্দর লাগছে শান্তনুর। এইসবই যেন হচ্ছে ওইরকম স্লো মোশনে, কম ফ্রেম রেটে।  টানা তাকিয়ে থাকতে সঙ্কোচ হচ্ছে ওর, যেন কোন পর্দানশীন পারস্য সুন্দরীর নিষিদ্ধ সৌন্দর্য তার অগোচরে দেখে ফেলেছে সে। সিনেমায় সুন্দরী মেয়েরা কী রকম পটাপট চুমু খায়। শান্তনুর খুব ইচ্ছে হল তোতাকে জড়িয়ে ধরে ওর ঠোঁটে একটা চুমু বসিয়ে দিতে। ওর কোমর থেকে আঁচলটা সরে গেছে, ওর নাভির একটু নীচে যেখানে শাড়ীর কুঁচি দিয়েছে সেই জায়গাটা ভারী সুন্দর দেখাচ্ছে। শান্তনু ঈশ্বরে বিশ্বাস করে না কিন্তু এখন ওর মনে হচ্ছে পৃথিবীতে এমন কি কেউ আছে যার কাছে এই মুহুর্তে সময়টা স্থির করে দেওয়ার ক্ষমতা আছে, এর পরে সময় যেন আর না এগোয় আর না হলে এখনই যেন ওর মৃত্যু হয়, সুখ তো কারোও চিরকাল স্থায়ী হয়না একদিন তো খারাপ সময় আসবেই তবে আজকের পরে, এই মুহুর্ত থেকে ও আর কোন দুঃখ সহ্য করতে রাজি নয়।

কিন্তু মুশকিল হল তোতার কথা ও এখনও শুনতে পারছেনা। শুধু তাই নয়, আশপাশের কোনও শব্দই ও শুনতে পারছে না। ওর কথাও হয়ত তোতার কানে যাচ্ছে না। কিন্তু তোতার ঠোঁটটা আস্তে আস্তে নড়ছে। শান্তনু চেষ্টা করল ওর লিপ্‌ রিড করতে। ঠিক এই মুহুর্তেই বিধি বাধ সাধল, শান্তনু যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হল। ও আজ, এখন তালসারিতে করছেটা কি? বিদ্যুৎঝলকের মত ওর মনে পড়ে গেল আজ তো ওর কী যেন একটা কাজ ছিল, কোথাও যাওয়ার কথা ছিল ওর সকাল সাড়ে দশটায়। এখন সাড়ে আটটা, এক্ষুনি গাড়ি ছোটালে কলকাতা পৌঁছোন যাবে হয়ত। প্রায় শ’চারেক কিলোমিটার ও নাকি গাড়িতে দু ঘণ্টায় পাড়ি দেবে, কী উদ্ভট চিন্তা, অবশ্য সঙ্কটের সময়ই এই রকম অবাস্তব সম্ভাবনার কথা মাথায় আসে। রাজ্যের চিন্তা ওর মাথায় চেপে বসল। শান্তনু ভাবল এটাই তো স্বাভাবিক, ওর ভাগ্যে এত সুখ সইবে কেন, কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে একেবারে বিপ্রতীপ মানসিক অবস্থান – জীবন ভারী অদ্ভুত। কত কিছু বলবে ভেবেছিল আজ তোতাকে, ওর হাত ধরে হেঁটে যেতে পারত কিছুদূর, কোথায় কী।

অবশ্য তোতা ওকে এখনো কি যেন বলার চেষ্টা করে চলেছে। শান্তনু ওকে মাঝপথে থামিয়ে জিজ্ঞেস করল- ‘এই তোতা, রাসেল স্ট্রীট চেনো তুমি? আমাকে আজ যেতে হবে। ৪/এ রাসেল স্ট্রীট।’ এমনিতে ওর সাথে তোতার তুই এর সম্পর্ক। আজকালকার ছেলেমেয়েদের প্রেমে এমন হয়, ভালোবাসার সম্বোধন পালটে গেছে। কিন্তু আজ এমনিই শান্তনুর ওকে তুমি বলতে ইচ্ছে হচ্ছে। আদিখ্যেতা।

তোতা অবশ্য শান্তনুর কথাটা গ্রাহ্যই করল না, ও হেসে শান্তনুর বুকে একটা মৃদু ঠেলা মারল। শান্তনুর এখন আর মাথার ঠিক নেই, ওকে যে করেই হোক আজ সেখানে যেতেই হবে। তোতা আবারও বার কয়েক ঠেলা মারল শান্তনুকে, এবার যুগপৎ একটা প্রবল কাঁধ ঝাঁকুনি আর একটা পুরুষ কণ্ঠ – ‘আরে ও দাদা, নামেন নামেন, ময়দান এসে গেছে। নামবেন তো নাকি?’ জানলার ধারের সীটটা থেকে তড়াক করে লাফ মেরে উঠে ভিড় বাসে ঝুলতে থাকা বাদুড়গুলোকে একে একে ডজ করে ঠিক সাত সেকেন্ডে বাস থেকে যথাস্থানে নামতে সক্ষম হল শান্তনু। পাশের বাচ্চা ছেলেটা ভাগ্যিস ডেকে দিল সময় মতন, টিকিট কাটার সময় ও যে কন্ডাক্টারকে বলেছিল কোথায় নামবে সেটা ছেলেটা শুনেছিল নিশ্চয়ই, মনে করে ডেকে দিল। তাড়াহুড়োতে ছেলেটাকে একটা ধন্যবাদ ব্যঞ্জক দৃষ্টিও দিয়ে আসতে পারল না।  যাই হোক, এখন সময়মত পৌঁছতে পারা নিয়ে কথা। নিজের শরীরের দিকে তাকালো একবার শান্তনু। ইস্‌, সকালের ইস্ত্রি করা জামাকাপড়ের তিন অবস্থা, ব্যাড, ভেরি ব্যাড, ভেরি ভেরি ব্যাড।

বাসটা বেশ ভালই টেনেছে। সময় মত পৌঁছেও গেছে, এখন দশটা কুড়ি। অফিসটা খুঁজে পেতে দশ মিনিটের বেশী লাগার কথা নয়। তবে একটা আয়না পেলে ভালো হত, বাসে কিছুক্ষণের জন্য চোখ লেগে গিয়েছিল তো – এখনও হয়ত চোখটা লাল হয়ে আছে, এখনও যেন একটু ঘুম লেগে আছে, জ্বালাও করছে একটু। কাল প্রায় সারারাত জেগে পড়েছে শান্তনু, রাতে মেরে কেটে দুই আড়াই ঘণ্টা ঘুমিয়েছে সে।। আজ ওর ইন্টারভিউ আছে।  অফিসের ঠিকানা ৪/এ রাসেল স্ট্রীট। গোঁয়ারগোবিন্দ ছেলে বটে একটা। বাস থেকে নেমে কাউকে জিজ্ঞেসও করে না। ট্রাফিক পুলিশকে জিজ্ঞেস করলেই ঝামেলা মিটে যায়। তা নয় ও একে তাকে জিজ্ঞেস করে চলতে শুরু করল একেবারে উল্টোপথে শেক্সপিয়র সরণীর দিকে। যখন পৌঁছল তখন বাজে এগারোটা দুই।

রিসেপশনে গিয়ে জানল যার সাথে তার দেখা করতে হবে তিনিই এখনও এসে পৌঁছননি। বাঁচোয়া, লোকটা জানতে পারবেনা যে সে এত দেরী করেছে। নইলে ইন্টারভিউ দিতে এসে কেউ আধ ঘণ্টা পরে এলে চাকরীটা পাওয়ার পর সে সাপের পাঁচ পা দেখবে এমনটা সেই রিক্রুটার ভদ্রলোক ভাবতেই পারেন। ভদ্রলোক এরও পনের মিনিট পর এলেন। শান্তনু ভালো করে দেখতে পেলো না তাকে। শান্তনু ছাড়াও আরও পাঁচজন বসে আছে ইন্টারভিউ-এর জন্য। শান্তনুর ডাক এল প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা পর। এর মাঝে শান্তনু এক বারও বেরোয়নি, সিগারেট খাওয়ার জন্যও নয়, সব সময়ই ওর মনে হচ্ছিল এই বুঝি ওর ডাক পড়ল। শান্তনুকে যখন সেই রিসেপশনিষ্ট মেয়েটি ডাকল ও অদৃশ্য একটা ক্যামেরা কল্পনা করে নিজের মুখে ফোকাস রেখে মেয়েটি যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখান থেকে নিজের দিকে একটা ছোট্ট ট্রলি শট্‌ নিয়ে নিল, ঠিক এইরকম একটা শট্‌ ও দেখেছিল একটা ফরাসী সিনেমাতে। ও সিনেমা দেখতে খুব ভালোবাসে। যত রাজ্যের আঁতেল সিনেমা দেখে। ইয়ুরোপিয়ান, কোরিয়ান, তুরস্ক, ইরানের ছবি জোগাড় করে করে দেখে। বুঝতে না পারলে বারবার দেখে, তাও না বুঝলে ইন্টারনেট ঘেঁটে ছবির সিনপ্‌সিস্‌ জোগাড় করে সেগুলো পড়ে। তোতাকে ইম্প্রেস করতে এসব ফান্ডা খুব কাজে লেগেছিল।

       সাড়ে তিন মিনিট হয়ে গেল, উনি ছাড়াও যে ঘরে আরেকটি ছেলে বসে আছে সেটা ইন্টারভিউয়ার ভদ্রলোক গ্রাহ্যের মধ্যই আনছেন না। লোকটার নাম আবার ভুবন সোম। সত্যিই যেন আজ শান্তনুর সাথে সব সিনেম্যাটিক ব্যাপার ঘটছে। বাসে ঘুমিয়ে পড়ে স্বপ্ন দেখা থেকে শুরু করে এই মুহূর্ত পর্যন্ত। এ পর্যন্ত যতগুলো ইন্টারভিউ সে দিয়েছে সব সময়ই মনে হয়েছে এই বুঝি সামনে বসে থাকা ইন্টারভিউয়ার বজ্রনিনাদ মন্দ্রস্বরে জিজ্ঞেস করলেন ‘হোয়াট ইজ দ্য ওয়েট অফ দ্য মুন?’। না, তা হয়নি বটে তবে অন্য অনেক অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন যেমন ‘ক্ষিদে পেয়েছে?’, ‘বাবা কী করেন?’, ‘ভদ্‌কার পেগ বানাতে জান?’,’নিজের বাড়ি না ভাড়া বাড়ি, না ফ্ল্যাট?’ ইত্যাদি ইত্যাদি, এসব ওর অভিজ্ঞতায় আছে। তবে এ ভদ্রলোক সে সবের ধারই ধারেন না। সাত মিনিট হয়ে গেলো উনি মৌনী ভাঙ্গেননি। শান্তনু মনে মনে ভাবল – প্রতিদ্বন্দ্বীর ধৃতিমানের মত দিই সালা টেবিলটা উলটে, দিই, দিই না, কী আর হবে? চাকরীটা হবেনা এই যা। তা তো এমনিতেই হবে না।

       ‘হোয়াট’স ইওর নেম জেন্টলম্যান?’ অবশেষে, টেবিলের উল্টোদিক থেকে আওয়াজ এল। লোকটা   বোবা নয় তাহলে।

       ‘শান্তনু লাহিড়ী ‘- উওর দিলেন শ্রীমান।

       – ‘ইট’স বিন আ লং ডে, ইজন’ট ইট ডিয়ার? হ্যাভ ইউ হ্যাড আ হেক অফ আ ট্রাবল রিচিং হিয়ার?’

       – ‘সার্টেনলি নট স্যার। ডায়রেকশানস ওয়ার গিভেন অন দ্য পোর্টাল ভেরি ক্লিয়ারলি।  ‘

       – ‘আপনার হাতঘড়িটা কি রাইট টাইম দিচ্ছে?’

       – ‘হ্যাঁ স্যার।’

       – ‘মনে তো হচ্ছে না।’

       – ‘মাফ করবেন, কিন্তু আপনার এরকম মনে হওয়ার কারণটা কি জানতে পারি?’

       – ‘ওয়েল ডিয়ার, আমাদের সদর দরজায় না একটা ভিজিল্যান্স ক্যামেরা বসানো আছে। যখনই কেউ ঐ ক্যামেরাটার সামনে দিয়ে যাওয়া আসা করে, তার একটা বেশ স্পষ্ট ছবি ঐ ক্যামেরায় উঠে যায়। সেইরকমই একটা ছবি আমি এই মুহুর্তে দেখতে পাচ্ছি, যেটা তোলা হয়েছে এগারোটা বেজে চার মিনিটে। একদম তোমার মত দেখতে একটা লোককে এই ছবিতে দেখা যাচ্ছে আমাদের অফিসে ঢুকতে। তাজ্জব ব্যাপার!’

        -‘আপনি যার কথা বলছেন, আমিই সেই লোক ! ‘

        -‘আপনিই?’

       -‘হ্যাঁ স্যার।’

       -‘বেশ, বুঝলাম। আপনার কথা মত, আপনার আমাদের অফিসে আসতে কোন অসুবিধা হয়নি। তার মানে ধরে নেওয়া যায়, আপনি ঠিক সাড়ে দশটার সময় আমাদের অফিসে রিপোর্ট করেছেন। অথচ আমি কম্পিউটার স্ক্রীনে যে সময়টা দেখতে পাচ্ছি, সেটা হল এগারোটা বেজে চার মিনিট। বোধহয় আমার মেশিনটাই খারাপ হয়েছে, লোক ডাকতে হবে মনে হচ্ছে।’

       – ‘লোক ডাকার কোন প্রয়োজন নেই স্যার। আপনার মেশিন একদম ঠিক আছে। আমি এখানে ঐ রকম সময়েই ঢুকেছি, এগারোটার আশেপাশে।’

       – ‘আপনি কি তাহলে বুঝতে পারলেন, যে আপনি ইতিমধ্যেই একটা পরীক্ষায় পাশ করতে পারলেন না ?’

       – ‘ হ্যাঁ স্যার, এখন বুঝতে পারছি।’

       ব্যাপারটা হাতের বাইরে চলে গেছে। শান্তনুর মনে হল ও এবার লোকটাকে খেউড় করে ঘর থেকে বেরিয়ে চলে যাবে। তিন মাস আগে ঠিক এরকমই করেছিল একটা ইন্টারভিউতে। আবার প্রশ্ন এল।

       – ‘আপনি এর আগে কোন চাকরি পান নি কেন?’

       – ‘হয়তো কোন ইণ্টারভিউয়ারের যোগ্যতার মাপকাঠিতে আমি উৎরোতে পারিনি বলে।’

       – ‘নাকি আপনি সেই সব জায়গাতেও আধ ঘন্টা দেরীতে পৌছেছিলেন বলে?’

       শান্তনু এটার কোন উত্তর দিল না। একটা ওয়ান শটার বন্দুক থাকলে এক্ষুণি লোকটাকে গুলি করে পালাত, এটা ভাবতেই ব্যস্ত ছিল ও। লোকটার শেষ কথাটা ভালো করে শোনেওনি বোধহয়।

       – ‘এর আগে কতগুলো ইন্টারভিউ দিয়েছেন?’

       – ‘চারটে, স্যার’

       – ‘হুম্‌ …একটা কথা বলুন, আপনার পরীক্ষার মার্কস-টার্কস বেশ ভাল, টেকনিকাল স্কিল ও যথেষ্ট ভাল, তবুও আপনি বেকার বসে কেন?’

       – ‘আসলে স্যার, মানে…’

       – ‘আচ্ছা আপনার কি আদৌ চাকরির দরকার আছে? বা কখনো ছিল ? আপনাকে দেখে তো মনে হচ্ছে না। সত্যি কথা বলতে কি, আপনার বডি ল্যাঙ্গোয়েজ কিন্ত বেশ নেগেটিভ।’

       – ‘ঠিক তা নয় স্যার, আসলে…’

       – ‘দাঁড়ান ভাই দাঁড়ান। প্রশ্নের উত্তরটা আমিই দিয়ে দিচ্ছি। আসলে আপনি প্রত্যেকবারই ইন্টারভিউয়ারয়ের কাছে একটা অতিচালাক, নিশ্চিন্ত ভাব নিয়ে হাজির হন, আর আশা করেন যে আপনার বয়সের থেকেও বেশী অভিজ্ঞতাসম্পন্ন, বিচক্ষণ একজন ব্যক্তিকে আপনি বোকা বানাতে পারবেন। খুব স্বাভাবিক ভাবেই আপনি শেষ অবধি ব্যর্থ হন এবং ধরে নেন যে গোটা দুনিয়াটা আপনার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছে। এবং শেষ পর্যন্ত আপনি এই সিদ্ধান্তে আসেন যে, আপনি দুনিয়ার সবচেয়ে দুর্ভাগা লোক, যার ভাগ্য কোনদিনই শিকে ছিড়বে না, আর শেষ পর্যন্ত আপনাকে একজন ক্রিমিনাল বা পলিটিশিয়ানই হতে হবে, যেখানে আপনি আপনার পছন্দ মত দল বদল করতে পারবেন।’

       -‘না স্যার, আমি…’

       – ‘ওহ, কামন…’

       -‘ না স্যার, আমি আমার ভাগ্যকে কখনোই দোষ দিই না। আমি এটাও মনে করি না যে আমার গোটা জীবনটা শেষ হয়ে গেছে, আর আমাকে সব কিছু শুরু থেকে শুরু করতে হবে। আমি এমন একটা দেশে জন্মেছি, যেখানে শিশুমৃত্যুর হার গোটা পৃথিবীর উনত্রিশ শতাংশ, আর সামগ্রিক চিত্রটা সাহারা অঞ্চলের অখ্যাত দেশগুলোর থেকেও খারাপ। যেখানে গোটা ভারতবর্ষের সদ্যজাত শিশুদের গড় আয়ু মাত্র তিন দিন, সেখানে আমার বয়স এখন চব্বিশ। এবং আমি সুস্থ দেহে, কোনরকম শারীরিক প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই আপনার সামনে বসে আছি। সুতরাং, আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করতে পারি। আমি সেই তেইশ শতাংশ ভাগ্যবান ভারতীয়দের মধ্যে একজন, যাদের মাসিক আয় ছ’শো টাকায় পৌছানোর জন্য মাথার ঘাম পায়ে ফেলতে হয় না। আমি তিন বেলা ভর পেট খেতে পাই। বেঁচে থাকার জন্য আমি জীবনের কাছে এর চেয়ে বেশী কিছু চাইতে পারি না। হ্যাঁ, আমার দরকার একটা চাকরি, টাকা, হয়তো একটা গাড়িও, আর এই গরমের দেশে একটা এয়ার কন্ডিশনার হলেও মন্দ হয় না। আমার এই সবকিছুই চাই। কারণ আমি শুধু বেঁচে থাকতে চাই না, আমি বাঁচার মত করে বাঁচতে চাই।’

       – ‘আপনি চা বা কফি কিছু নেবেন?’

       – ‘না স্যার, ধন্যবাদ।’

       – ‘ঠিক আছে, তাহলে আজকের মত আসুন।’

ইন্টারভিউ শেষ করে শান্তনু বেরোল পাক্কা বিয়াল্লিশ মিনিট পরে। তখনও আর একজনের ইন্টারভিউ বাকি। শান্তনু জানে কী হতে চলেছে। এটা এখনকার কর্পোরেট সংস্কৃতি, এরা এখন কাউকে ‘না’ বলে না, বলে তোমাকে দু দিনের মধ্যে জানিয়ে দেওয়া হবে, কাউকে বলে চার দিন কাউকে সাত দিন এরকম। ওকে আজ বলল তিন দিন পরে ওকে জানানো হবে। বলার মধ্যে শুধু এইটুকু বলেনি যে ওরা ঘন্টা, মিনিট, সেকেন্ডের হিসেবে সময় দেখেনা। ওদের সময় মাপার একক আলোকবর্ষ, এক ঘন্টা = এক আলোকবর্ষ এইরকম কিছু একটা। সেই হিসেবে দু  দিন, চার দিন হতে যতটা সময় লাগে আর কি, তার মধ্যে জানিয়ে দেবে নিশ্চিত।

চার-পাঁচ ঘণ্টা হয়ে গেল বাড়ি থেকে নিশ্চয়ই বেশ কয়েকবার ফোন করেছে ওকে। ঠিক তাই, ওর মায়ের সতেরোটা মিস্‌ড কল আর একটা মেসেজ। তোতার এস.এম.এস। লিখেছে ‘ভালো করে ইন্টারভিউ দিস্‌, মাথা গরম করে ভুলভাল কথা বলিস না। ভালো থাকিস।’

মাথা খারাপ হয়ে গেছে তোতার। সকাল থেকে উপোস করে আছে তো তাই মাথাটা গোলমাল করেছে নিশ্চয়ই। বিয়ের দিন এসব করার মানে আছে কোনও, ও জানলই বা কি করে শান্তনুর আজ ইন্টারভিউ আছে। সেটা কোন বড় ব্যাপার নয় যদিও, জেনে থাকতেই পারে। এই, কিছু ফেলে এলাম না তো? হঠাৎ মনে হল শান্তনুর। ব্যাগের ভিতর হাতড়ে দেখল সব কিছু ঠিকঠাকই আছে তবে ব্যাগের একটা পকেটে একটা জিনিস বাড়তি মনে হল। কী সেটা – ওহ্‌, তোতার বিয়ের কার্ড। আজ তো ওরও যাওয়ার কথা, ছিল।

তোতা এটা একটা ভালো কাজ করেছে বটে, আজ থেকে ঠিক সতেরো দিন আগে তোতা ওকে ফোন করে ডাকল ওকে ওর বিয়ের কার্ডটা দেওয়ার জন্য। ওর হাতে কার্ডটা দিল, দিয়ে বলল বাড়ি গিয়ে খুলে দেখতে। শান্তনু তাই করল, বাড়ি ফিরে খুলে কার্ডটা দেখল, ভারী সুন্দর। একটা ছোট মত কাগজের টুকরোও আছে ভিতরে। খুলে দেখল তোতা নিজের হাতে লিখেছে, প্লিজ্‌ আসিস না। প্লিজ্‌টা আবার ইংলিশে লিখেছে। তার মধ্যে তোতার লেখা ‘P’ অক্ষরটা শান্তনুর দৃষ্টি আকর্ষণ করল। সত্যজিৎ রায়ের নিজস্ব ক্যালিগ্রাফিক সৃষ্টির মধ্যে ওনার নিজের সবচেয়ে প্রিয় ছিল রে – রোমান হরফ। শান্তনু জানে, একসময় ওগুলো নিয়ে চর্চা করেছে সে। বিভিন্ন নমুনা দেখে দেখে, নানান বই ঘেঁটে, কলেজস্ট্রীট থেকে ক্যালিগ্রাফির বিশেষ পেন আর খাতা নিয়ে এসে প্র্যাক্টিস করত নিজেও। ওফ, তুখোড় ছেলে, বহুমূখী প্রতিভা। তা সে যাই হোক। তোতার লেখা প্লিজ্‌টার মধ্যে ‘P’ টা অবিকল  রে – রোমান ফন্ট স্টাইলে হয়েছে, অন্তত শান্তনুর তাই মনে হয়েছে। কী আশ্চর্য। তা ভালোর মধ্যে যা ভালো তা হল, গেলে তো ও আর খালি হাতে যেতে পারত না, কিছু না কিছু নিয়ে যেতে হত। শ’খানেক টাকার ধাক্কা। উফ্‌, ভাগ্য করে একটা প্রেমিকা পেয়েছিল বটে, কত বোঝে।

রাস্তা কিছুই বুঝতে পারছেনা। আনতাবড়ি হেঁটে চলেছে শান্তনু। যেতে যেতে একটা জায়গায় এল, একটা ছোট মত রাস্তা, কী নাম কোন্‌ জায়গা কিছুই বুঝছেনা সে। কী দারুণ তেলেভাজা বানাচ্ছে এখানে একটা দোকানে। রাস্তার দুধারে অনেক অফিস আছে, সেখান থেকে লোকজন বেরিয়ে এসে খাচ্ছে। দেদার বিকোচ্ছে চপ, ফুলুরি, বেগুনি, পেঁয়াজি। শান্তনুর খুব খেতে ইচ্ছে হল, ওর কাছে তেইশ টাকা আছে। লোভটা কোনও ভাবে সম্বরণ করে ভাবল এই গরমে বেশী হাঁটতে খুব কষ্ট হচ্ছে। বাসস্টপ থেকে ওর বাড়ি অবধি অনেকটা হাঁটা পথ। তার চেয়ে বরং বাস থেকে নেমে ওর বাড়ি অবধি অতটা না হেঁটে অটোতে যাবে। ছোট মত রাস্তাটা ধরেই এগোতে লাগল শান্তনু, রাস্তাটা সরু হতে হতে ক্রমশ একটা গলির আকার নিল। এবার বড় রাস্তায় এসে পড়ল। কলকাতা কর্পোরেশন কলকাতার অনেক রাস্তার সামনে একটা করে পিলার বসিয়েছে, সেটার উপর সুন্দর করে বাংলা আর ইংলিশে সংশ্লিষ্ট জায়গা বা রাস্তার নামটা লিখে রাখা আছে। খুব ভালো কাজ করেছে এটা, অচেনা জায়গায় মুশকিলে পড়তে হয়না। শান্তনু গলিটা থেকে বেরিয়ে বড় রাস্তায় পড়েই  খেয়াল করল বাঁ হাতে এরকমই একটা পিলার, তাতে লেখা ‘প্রিটোরিয়া স্ট্রীট’। ডানদিকে সোজা হেঁটে বেড়িয়ে গেলে রবীন্দ্র সদন। এই রাস্তা থেকেই বাস পেয়ে  যাবে। নিজের অজান্তে নিজেরই সুবিধা করে নিয়েছে শান্তনু। ওকে আর ব্রেক জার্নি করতে হবে না। একটা বাসে চেপেই বাড়ি পৌঁছে যাবে।

শান্তনু মোবাইল আর রুমাল রাখে এক পকেটে আর মানিব্যাগ থাকে অন্যটায়। আজ গোটা দিনটাই বড় অদ্ভুত, আসার সময় বাসভাড়া মিটিয়ে মানিব্যাগটা পকেটে চালান করার পরথেকে একবারের জন্যও ওই পকেটটা হাতড়েও দেখেনি শান্তনু। মাঝখানে একটা সিগারেটও খেতে ইচ্ছে করল না তার। ওই দোকানটা থেকে তেলেভাজা খাবে খাবে করেও খেলোনা শান্তনু, কাজেই ও টের পায়নি যে ধর্মতলার ফুটপাথ থেকে ক্লাস ইলেভেন-এ কেনা ওর প্রথম মানিব্যাগ যার ভিতর থাকা দুটো দশ টাকার নোট আর তিন টাকার খুচরো পয়সাকে পাথেয় হিসেবে ধরে ও বাড়ি ফেরার বাজেট নির্ধারণ করেছে সেটা এখন আর যথাস্থানে নেই। এক ছিঁচকে চোর ওকে বেকুব বানিয়ে সেটা ঝেপেছে এবং খুলে খান বিশেক টাকা আর একগাদা বাজে কাগজ পেয়ে আশাহত হয়ে, ওকে উদ্দেশ করে কিছু কুৎসিত গালাগাল দিয়ে সেটা ফেলে দিয়েছে, এটা এই মূহুর্তে ওর চিন্তার বাইরে।

সন্ধ্যের আকাশে লালচে আভা দেখা যাচ্ছে। একটু একটু মেঘ করেছে মনে হচ্ছে, গুমোট ভাবটাও দুপুরের থেকে বেশ কম। থেকে থেকে ধুলো উড়িয়ে এক দমকা হাওয়া দিচ্ছে। ঠাণ্ডা হাওয়া, মনে হচ্ছে কালবৈশাখী শুরু হবে কিছুক্ষণের মধ্যেই, খবরে বলছিল বটে। বাসটা চট্‌ করে পেয়ে গেলে হয়।

ওই তো বাস এসে গেছে। যা ভিড় হবে বলে শান্তনু ভেবেছিল তার চেয়ে বেশ কম ভিড়। একটু এগিয়ে গিয়ে এক্সাইড মোড় পর্যন্ত গেলে হয়ত আরও ফাঁকা পেতো, বসার জায়গাও পেতে পারত, বেশীর ভাগ লোক এই সময় ওইখান থেকেই ওঠে। জ়ে এন এন ইউ আর এম এর বাসগুলো বেশ ভালো। দাঁড়িয়ে থাকতেও মন্দ লাগে না। বড় বড় জানলা দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেও বাইরেটা দেখতে পাওয়া যায়। ভাবতে ভাবতে ড্রাইভারের দরজার দিকে চোখ গেলো শান্তনুর। কয়েকজন লোক পরের স্টপে নামবে বলে ভিড় করে আছে। জনা পাঁচ-ছয় লোক গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে আছে তবু একটা পার্পল্‌ রঙের গেঞ্জি পরা একটা কমবয়সী ছেলের উপর বেশী করে চোখ পড়ছে শান্তনুর। সত্যি বলতে কি ওই ছেলেটাই বাসের সামনের গেটে শান্তনুর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এরকম মনে হবার কারণ কী? ছেলেটা কি ওর চেনা কেউ? কোথাও দেখছে ওকে। না, ওকে বেশী খাটতে হল না। হুম, কোন ভুল নেই, এই ছেলেটাই তো ওকে আসার সময় বাসে ঘুম থেকে ডেকে তুলেছিল। ও মনে করে না ডাকলে শান্তনুর তো ইন্টারভিউটা দেওয়াই হত না। তখনও ছেলেটা এই গেঞ্জিটাই পরেছিল। তবে ও ওই বয়স্ক লোকটার গায়ের উপর ওভাবে ঝুঁকে পড়ে দাঁড়িয়ে আছে কেন?

নতুন বাসগুলোতে ট্রেনের মত হাতল লাগানো,  বাস চলার সাথে সাথে সেগুলো রড বেয়ে এদিক ওদিক দোলে। শান্তনুর পাশের লোকটা একটু বেঁটে, তাই সে ওই হাতলগুলোর নড়াচড়াটা কন্ট্রোল করতে পারছেনা, সেও এদিক ওদিক দোল খাচ্ছে। শান্তনু ভালো করে দেখতে পাচ্ছেনা ছেলেটাকে। ও খুব চেষ্টা করল পাশের লোকটাকে এড়িয়ে ছেলেটাকে দেখবার। বাসটা ব্রেক চেপেছে। স্টপে দাঁড়াবে। শান্তনু একটু পেছনে হেলে স্পষ্ট দেখতে পেল।

ছেলেটা অদ্ভুত দক্ষতায় ওই বয়স্ক লোকটার বাঁ পকেট ফাঁকা করে বাসটা স্টপেজে ভালো করে থামার আগেই চলন্ত বাস থেকে নেমে গেল। শান্তনু এরই মধ্যে নিজের বাঁ পকেটের শুন্যতা টের পেয়ে গেছে। কাউকে কিছু বলতে যাবে তার মধ্যেই বাস স্টপেজে লোক নামিয়ে দিয়ে স্টার্ট দিয়ে দিয়েছে। শান্তনু, ‘দাঁড়াও, দাঁড়াও…ওই ছেলেটা…ওকে ধর…আরে নেমে গেল যে…’ বলে চেঁচাতে লাগল। ভালো করে গুছিয়ে বলার সময়ও আর নেই, কেউ বুঝল, কেউ বুঝল না। শান্তনু এবার একটা সাংঘাতিক কাজ করল। ও ঠিক করে নিয়েছে কী করবে, ও চকিতে চলন্ত বাস থেকে রাস্তায় নেমে কিছুদুর ছুটে ছেলেটাকে দেখতে পেল। ছেলেটাও হয়ত আন্দাজ করেছিল যে ওর নামার অব্যবহিত পরেই বাসের লোকজন ওর শিল্পকর্মের মর্ম অনুধাবন করতে পেরেছে, কেউ কেউ তাকে পুরস্কৃতও করতে চাইবে। থেকে থেকে পেছনে ফিরে তাকাচ্ছিল। পেছনে একজনকে ছুটতে দেখে সেও পাল্‌টা দৌড় লাগালো যদিও সে এখনও বুঝে উঠতে পারছেনা যে একজনই তাকে ধাওয়া করেছে না অনেকে।

বেকবাগান থেকে দুটো ছেলে নাগাড়ে ছুটে চলেছে। সে এক চিত্তির, একজন অপরজনকে তাড়া করছে। আজই ঘণ্টা আষ্টেক আগে সকাল ন’টার সময় শান্তনু ইন্টারভিউ দিতে আসার জন্য যখন বাড়ি থেকে বেরোচ্ছিল তখনও কি ও ভাবতে পেরেছিল আজ সন্ধ্যেয় ওর বয়সী আর পাঁচটা চাকুরে ছেলে যখন বান্ধবীকে নিয়ে ছবি দেখতে যাচ্ছে, বেকার ছেলেগুলো আরও সাড়ে বারো টাকা বাকি রেখে পাড়ার দোকান থেকে সিগারেট কিনছে, ওর পাড়ার ছেলেরা ফুটপাথে গাছের ডালে বাল্ব ঝুলিয়ে ক্যারম বোর্ড পেতে ওর জন্য অপেক্ষা করছে তখন শ্রীমান শান্তনু লাহিড়ী দক্ষিণ কলকাতার ব্যস্ত রাস্তায় পকেটমার ধাওয়া করছেন। ও ইশারায় রাস্তায় অন্যদেরকে বলছে ওই ছেলেটাকে থামানোর জন্য, চেঁচিয়ে বলছে ‘ও মশাই ছেলেটাকে ধরুন, ও ব্যাটা পকেটমার’। নিন্দুকেরা যাই বলুক, কলকাতার মানুষ এখন অনেক পালটে গেছে, অত হুজুগে নেই। এখন ওই গণধোলাই কালচারটা আর নেই।। কোন লোক যদিও বা টের পায় তার পকেট কাটা গেছে আর পকেটমার তার নাগাল থেকে চম্পট দিচ্ছে সে খুব বেশী টেনশন খায় না। গড়পড়তা শহুরে মানুষ এখন সাথে বেশী ক্যাশ রাখে না, বড়জোর পাঁচশো টাকা, বাকিটা কার্ড। ওই ছুটে চোর ধরার থেকে কার্ড কোম্পানি বা ব্যাঙ্ককে জানিয়ে দিলেই কার্ড ব্লক্‌ড, চোর কিছু সুবিধা করতে পারবেনা।

কাঁধের ব্যাগটাকে ম্যানেজ করতে গিয়ে একটু অসুবিধায় পড়ছে শান্তনু, ওটার জন্য ঠিক করে দৌড়তে পারছেনা, ওতে অনেক দরকারি জিনিসপত্র রয়েছে তাই ছুঁড়ে ফেলে দিতেও পারছেনা। ওর ওয়ালেটে থাকার মধ্যে মাত্র তেইশ টাকা ছিল, আর ওর বাড়িও আহামরি দূরে নয়। একটা ট্যাক্সি ধরে বাড়ি ফিরে ভাড়া মিটিয়ে দিলেই হয়। তাছাড়া ওর ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই, পাসপোর্ট নেই, প্যান কার্ড আছে সেটা বাড়িতে। অর্থাৎ কোন দরকারি নথিও কিছু ছিল না ওর মানিব্যাগে যে এভাবে কোন কিছু তোয়াক্কা না করে একটা ক্রিমিনালকে ধাওয়া করতে হবে, আর কিছু নাহোক ওর কোনও ক্ষতি ছেলেটা তো করতেই পারে, ওর কাছে অস্ত্রও তো থাকতে পারে। ওরা এখন খুব অরগ্যানাইজ্‌ড, ওদের নির্দিষ্ট অপারেটিং জোন থাকে, কেউ মুশকিলে পড়লে ব্যাকআপ করার জন্য ধারেকাছে ওদের লোকজন সাধারণ মানুষের ভিড়ে মিশে থাকে। শান্তনু সম্ভাব্য বিপদের কথাটা ভাবতেই পারছেনা, ওর মাথাতেই আসছেনা।

ব্যাপারটা আসলে অন্য জায়গায়, ও জিনিসটাকে পার্সোনালি নিয়ে ফেলেছে, ও এটা মানতে রাজি নয়, যে ছেলেটা ওর পকেট মেরেছে সে তার পেশার তাগিদে করেছে, শান্তনুর জায়গায় ওর পাশের বাড়ির তারক সান্যাল হলেও ছেলেটার কিছু যেত-আসত না, বরং আরও অন্তত কুড়ি গুণ বেশী টাকা পাবার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু শান্তনুর রোখ চেপে গেছে, ছেলেটার হিম্মত হল কি করে? ও আর হারতে চায় না, ঢের হয়েছে। যে কেউ তার যা খুশি ওর উপর দিয়ে চালিয়ে যাবে এটা হতে দেওয়া চলে না।। তাকে ও ধরবেই আর উচিৎ শিক্ষা দেবে।

যাকে শান্তনু তাড়া করছে সেই ছেলেটার বয়স আঠেরো-উনিশ। সে রাস্তাঘাটের লোকজনকে ধর্তব্যের মধ্যেই আনছেনা, প্রায় ধাক্কা মেরে ঠেলে ফেলে-টেলে দিয়ে দৌড়চ্ছে। মাঝে মধ্যে ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে, শান্তনুকে ডজ করে মাঝে মাঝে রাস্তায়ে নেমে পড়ছে, ফুটপাথ বদল করছে। হাত দিয়ে গাড়ি থামিয়ে রাস্তা পার হচ্ছে। যাচ্ছে তাই কাণ্ড করছে। দিব্যি বোঝা যাচ্ছে এভাবে পালানোর অভিজ্ঞতা ওর যথেষ্ট রয়েছে। শান্তনুর কথায় সাড়া দিয়ে কেউ কেউ ছেলেটাকে ধাওয়া করছে বটে কিন্তু সকলেই পেরে উঠবেনা বুঝে রণে ভঙ্গ দিচ্ছে। ছেলেটার পালাতে অসহ্য লাগছে। এত নাছোড় লোকের পাল্লায় কখনও পড়েনি ও। এখন ওর এজেন্ডা হচ্ছে শান্তনুকে দৌড় করিয়ে নিজের ডেরায় টেনে নিয়ে আসা। রেসকোর্স পেরিয়ে ছুটে চলেছে। রাস্তায় ভিড় ক্রমশ পাতলা হচ্ছে, রেসকোর্স ছাড়িয়ে যাওয়ার পর পথ-ঘাট ক্রমশ নির্জন হচ্ছে। এতে শান্তনুর সুবিধেই হয়েছে অবশ্য। ছেলেটা চোখের আড়াল হচ্ছে না। সন্ধ্যের সময় এখানে থেকে থেকে পুলিশ প্যাট্রোলিং চলে কিন্তু এই মূহুর্তে ধারে কাছে শান্তনু সেরকম কিছু দেখতে পারছেনা।

শিড়িঙ্গে চেহারার ছেলেটার দম ফুরিয়ে আসছে। শান্তনু ওর সাথে দূরত্ব ক্রমশ কমিয়ে ফেলছে। ছেলেটা চট্‌ করে বাঁ দিকে ঘুরে গেল। আলিপুরের দিকে দৌড় লাগিয়েছে ব্যাটা। থেকে থেকে দাঁড়িয়ে পড়ছে, মাঝেমাঝেই থেমে থেমে হাঁপাচ্ছে, দেদার নেশা টেশা করে নিশ্চয়ই নইলে এই বয়সের ছেলে এইটুকু দৌড়ে এভাবে ধুঁকবে কেন, অবশ্য শান্তনুর এতে লাভ বই ক্ষতি নেই। আর খুব বেশী হলে পাঁচ সেকেন্ডের মধ্যে ও ছেলেটাকে ধরে ফেলবে।

ছেলেটা এবার শান্তনুর একফুটের মধ্যে চলে এসেছে। ওর দৌড়টা থামানো দরকার। শান্তনু ওর ডান হাতটা মুঠো করে ছেলেটার ডান কানের গোড়ায় একটা সজোরে ঘুসি মারল। একটা প্যাত করে চাপা আওয়াজ হল, শান্তনু ওর আঙ্গুলের গাঁটে ভিজে ভিজে কী একটা বোধ করল, রক্ত। বেশ জোরেই মেরেছিল, ওর নিজের হাতেও লেগেছে একটু। তবে ওর হাতে যে রক্তটা লেগে আছে সেটা ওর নয়, ছেলেটার কানের নিচের চামড়াটা একটুখানি ফেটে গেছে, কানটা হাত দিয়ে চেপে হাঁটু মুড়ে রাস্তায় বসে পড়েছে সে। ছেলেটা পেছন ফিরে ঘোরা মাত্র আবার একটা জোর ঘুসি, এবার মুখের বাঁ দিকটা, এরকম জোরে আর একবার ওই জায়গায় আরেকটা মারলেই মুখটা ফেটে যাবে ছেলেটার। যেমন ভাবা তেমন কাজ, শান্তনু ওকে আরেকটা ঘা দেওয়ার জন্য উদ্যত হল, ওমনি ছেলেটা সেকেন্ডের দশ ভাগের এক ভাগ সময়ের মধ্যে একটা কান্ড ঘটিয়ে ফেলল। ছেলেটা ওর গেঞ্জির আস্তিনটা সামান্য গুটিয়ে রেখেছিল। ডান হাত দিয়ে বাঁ হাতের আস্তিনের ভাঁজ থেকে কি একটা জিনিস দু আঙ্গুলে চেপে ধরে শান্তনুর গলার উপর একটা হাল্কার ওপর ব্যাকহ্যান্ড স্ট্রোক দিল ছেলেটা, শান্তনু গলার চামড়ার উপর একটু ঈষৎ ছ্যাঁকা অনুভব করল। তারপর গলা বেয়ে উষ্ণ তরলস্রোত, ঢোঁক গিলতে গেলে প্রচন্ড ব্যাথা লাগছে ওর। অফ্‌-হোয়াইট্‌ জামার উপর লাল ছোপ পড়ে যাচ্ছে, লাল রংটা ক্রমশ ছড়াচ্ছে। হ্যান্ডমেড পেপারে জল রঙ করলে অনেকটা এই রকম ভাবে রঙ ছড়িয়ে পড়ে সারা কাগজ জুড়ে। ছেলেটা আস্তে আস্তে ওর থেকে দূরে চলে যাচ্ছে, শান্তনুর ওকে বাধা দেওয়ার ক্ষমতা নেই আর। এই রাস্তাটা বোধহয় বাসরুট নয়। একটাও পাবলিক ট্রান্সপোর্ট যেতে দেখল না শান্তনু। শুধু প্রাইভেট কার আর ট্যাক্সি।  ওর চোখে গাড়ির আলোগুলো বড় বড় ঝাপসা রঙ্গীন বলের মত দেখাচ্ছে। দাঁড়িয়ে থাকলে পড়ে যাবে, ও এবার রাস্তার ধারে বসে পড়ল।

প্রায় ঘণ্টা দেড়েক কেটে গেছে। একটু হইচই, কোলাহল শুনে যেন কিছুটা বাহ্য জ্ঞান ফিরে পেল শান্তনু। পুলিশ এখন ওকে কোন কাছাকাছি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার তোড়জোড় করছে, পাশ থেকে কেউ একজন বলল ‘এখনও বাঁচানো যেতে পারে’, শান্তনুকে পুলিশ কিছু জিজ্ঞেস করছেনা, ওরা বুঝেছে ওর পক্ষে কথা বলা অসম্ভব। শান্তনুর ফোন নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করছে তারা, বাড়িতে খবর দেওয়া জন্য অবশ্যই।

শান্তনু এই সময় আগাগোড়া একটা কথাই আউড়ে চলেছে, যদিও সেটুকু বলতেও ওর ভীষণ কষ্ট হচ্ছে তবু বলতে ওকে হবেই। ও জানে ওর বাঁচা বেশ কঠিন। প্রচুর রক্ত বেরিয়ে গেছে ওর শরীর থেকে, বাঁচার জন্য অবিলম্বে ওর রক্ত দরকার। নিজের স্নায়ুর ওপর খুব ভাল দখল ছেলেটার, অসম্ভব কর্তৃত্ব। আফ্রিকার ব্ল্যাক মাম্বার সামনে পড়লে ও কতটা স্থিতধী থাকত সে প্রশ্ন অবান্তর। তবে পৃথিবীর শতকরা নব্বইভাগ মানুষ যেখানে প্রত্যাসন্ন মৃত্যুর মুখোমুখি এলে হয় দার্শনিক হয়ে ওঠে, আস্তিক হলে ভগবানের নাম জপ করে, নিজের সজ্ঞানে করা কুকর্মের জন্য ঈশ্বরের কাছে ক্ষমা চায়, কেউ কেউ মনে মনে ‘মরণ রে, তুঁহু মম শ্যাম সমান’ গান গায়। কিন্তু শান্তনু সেই একটা গোত্রেও পড়ে না, ও অসম্ভব প্র্যাক্টিকাল ছেলে আর ও বাঁচতে চায়। ডাক্তারের ওর রক্ত পরীক্ষা করে ব্লাড গ্রুপ নির্ধারণ করতে যত কম সময়ই লাগুক সেই সময়টুকুও নষ্ট হতে দিতে চায়না শান্তনু। এই নিয়ে গত পাঁচ মিনিটে এগারো বার শান্তনু  একটাই কথা বলল, ‘আমার ব্লাড গ্রুপ B+’।

Latest posts by শক্তি সোম (see all)