আগের পর্ব


চলচ্চিত্রায়নের মূল ভাগ তিনটি। প্রথমটি শুটিংয়ের আগের প্রস্তুতি, যাকে বলা হয় প্রি-প্রোডাক্সন, যার কথা আগে বলেছি। এর পর শুটিং। আর শেষে থাকে এডিটিং, ডাবিং, মিউজিক, এফেক্টস, মিক্সিং ইত্যাদি ইত্যাদি। শেষের এই পর্বটিকে বলা হয় পোস্ট প্রোডাক্সন।

শুটিংয়ের রীলগুলো থাকতো চারশ’ ফুটের। কিন্তু এডিট করার পর, মানে পর পর দৃশ্য সাজানোর পর যে রীলগুলি তৈরী হয়, সেগুলির দৈর্ঘ্য হয় হাজার ফুটের কাছাকাছি। ‘কাছাকাছি’ বললাম এই কারণে, সব সময় একদম হাজার ফুট তো হয়না, কিছু কম বেশী হয়ে যায়। এই রীলের মাপেই ছবির মাপ হয়। যেমন এগারো রীলের ছবি বা চোদ্দ রীলের ছবি। প্রতিটি রীলের চলন-সময়-কাল ন’ মিনিটের আশেপাশে। ‘আশেপাশে’ শব্দটিও ওই একই কারণে ব্যবহার করলাম।

এই রীলগুলি এডিটের সময় এক দিক থেকে অন্য প্রান্তে গিয়ে পাহাড়ের মতো জড়ো হত। সেগুলিকে আবার রীলের গোল চাকতিতে গুটিয়ে রাখার কাজটা মূলতঃ করতে হত সহকারী সম্পাদককে। কিন্তু আমার মজা লাগত, আমি স্বতস্ফূর্তভাবে কাজটা করতাম।

খাড়া দাঁড়ানো একটা কাঠের মাথায়, একটা পিনের মতো রড লাগানো থাকতো। সেটাতে ঝুলিয়ে দিতে হত ফাঁকা রীলের চাকতিটি। সেই চাকতির ভেতরে ফিল্মের একটি মাথা আটকে দিয়ে, প্রথমে ধীরে ধীরে, পরে দ্রুত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ফিল্মটা গোটাতে হত। এই গোটাবার জন্য ওই রীল ঝোলানোর রডের অন্য প্রান্তে গ্রামাফোনের দম দেবার মত একটা হাতল থাকতো। সেটা দিয়ে রীলটাকে ঘোরাতে হত।

ব্যাপারটা শুনতে যত সহজ মনে হল, ততটা কিন্তু নয়। কারণ, যখন ফিল্মটা ঘুরতে শুরু করে, তার একটা নিজস্ব গতি নেয়। তখন খেয়াল রাখতে হয়, নীচ থেকে আসা ফিল্মটা যেন কোথাও জড়িয়ে না থাকে। তাহলে টান পড়লেই ছিঁড়ে যাবে যে ফিল্ম। সে ফিল্ম জুড়ে দেওয়া যেতে পারে কিন্তু জোড়া লাগাবার যায়গার ফ্রেমটি ড্যামেজড হয়ে গেল। একটা চলচ্চিত্রে প্রতিটি ফ্রেমের সমান মূল্য।

তারপর গোটানো হয়ে গেলে, ওই চাকতি থেকে ফিল্ম রীলটা খুলে একটা ক্যানের মধ্যে রাখতে হত। এই কাজটা করার সময় অনেকবারই ফিল্মটা ফস্‌ করে খুলে ছড়িয়ে পড়ত। ব্যাস আবার গোটাও প্রথম থেকে। অতএব এটাও করতে হত সাবধানে।

আর একটি সাবধানতা খেয়াল রাখতে হত এ কাজে। ঘুরন্ত চাকতির সামনে ফিল্মটিকে আলগা হাতে ধরে থাকতে হত। যেন রীলের বাইরে চলে না যায়। ফিল্মের ধার বা এজগুলি কিন্তু খুব ধারালো, তাই সতর্ক থাকতে হত, হাত কেটে যাবার সম্ভাবনা থাকত। আমার হাত কেটেছেও অনেকবার।

এ তো বললাম ফিল্ম রীলের কথা, যেখানে কেবল ছবি দেখা যাবে। দ্বিতীয় যে রীল এর সঙ্গী হবে সে হল সাউন্ড অর্থাৎ শব্দ-রীল। এই রীলে শুটিং এর সময় ধরে রাখা অভিনেতাদের মুখের কথাগুলি ছবির ক্রম অনুযায়ী সাজিয়ে রাখা। অতএব ছবির রীলের সাথে এই শব্দের রীলও চালাতে হত এবং সেগুলিও ওই একই প্রকারে গুটিয়ে ক্যান বন্দী করে রাখা হত। ওই পর্যায়ে এগারো রীলের ছবি মানে আমাদের সব সময় বাইশ রীলের হিসেব রাখতে হত, জাস্ট ডাবল।

তুলে আনা ছবির সাথে তুলে আনা শব্দ মেলানোকে বলা হয় সাউন্ড সিঙ্কিং। মুখের কথা মেলানো হয় বলে একে লিপ সিঙ্কিংও বলে। এই মেলানোর সুবিধের জন্য শুটিংয়ের সময় ক্ল্যাপস্টিক ব্যবহার করা হয়। তার কথা পরদিন বলব।


পরের পর্ব