প্রচণ্ড রেগে গিয়ে শান্তনু বলল “তোদের না খেতে হয় খাস না, আমি একাই খাব। আর যখন খাব কেউ চাইলে একটা টুকরোও পাবি না বলে দিলাম”। বলেই গট গট করে বেরিয়ে চলে গেল।

সারান্ডার জঙ্গলে। ছবি সৌজন্যেঃ লেখক

সারান্ডার জঙ্গলে। ছবি সৌজন্যেঃ লেখক

সবে কুমডি থেকে থলকোবাদ বনবাংলোতে এসে পৌঁছেছি। ঝাড়খণ্ডের সারান্ডা ফরেস্টের এইদিকটা এমনিতেই ঘন জঙ্গল। কুমডিতে তো দুদিন যা গেল তাতে এমনিতেই বেশ কাহিল হয়ে ছিলাম আমরা। কোনোদিন যে পাহাড়ী ঝরনা থেকে জল বয়ে এনে, নিজেরা কুড়ুল দিয়ে কাঠ কেটে, নিজেদেরই রান্না করে খেতে হবে সেটা আগে চারজনের কেউই ভাবিনি। তারপর রাত দুপুরে খিদে পেয়ে গেল..এদিকে রান্নাঘর বাংলো থেকে অনেক দূরে আর ড্রাইভার বলে গেছে রাতে বেরলেই  ‘ হাথি, ভালু ’ সবাই আমাদের আক্রমণ করবে বলেই বসে আছে …. সেই ভয়ে বাংলোর ফায়ার প্লেসেই ডিম সেদ্ধ বসিয়ে দেওয়া … খিদে তো মিটল … এদিকে বাংলোর বাইরে বেরিয়ে দেখি গোটা কুমডি আমাদের ফায়ার প্লেসের চিমনি দিয়ে বেরোনো ধোঁয়াতে সাদা হয়ে গেছে … মোদ্দা কথা হল এইসব কান্ডকারখানা ঘটিয়ে আমাদের মানসিক ক্লান্তি যথেষ্টই ছিল … তারপর আজ রাত্তিরে থলকোবাদ ওয়াচ টাওয়ারে সারা রাত কাটিয়ে প্রচুর জন্তু জানোয়ার দেখার অপেক্ষায় টানটান … চৌকিদার সারগেই বলেছে পকৌড়া ভেজে দেবে, কিন্তু টাওয়ার থেকে নামা চলবে না, কয়েক মাস আগে তিনটি ছেলে বারণ না শুনে রাতে নেমে পড়েছিল, তাদের একজনকে ভাল্লুক কামড়ে মাংস তুলে নেয় … আর সাথে কম্বল মাস্ট .. ওদিকে মহুয়ার গন্ধে ম ম করছে গোটা জঙ্গল .. সব মিলিয়ে হইহই ব্যাপার …… তার মধ্যে এই কাণ্ড……

কাণ্ড আর কিছুই না – আসার পথে রাস্তায় কয়েকটা বন মুরগির সাথে একটা ময়ূরকে চরে বেড়াতে দেখেই শান্তনুর মাথা খারাপ…… জিপ থামিয়ে তিড়িং করে লাফ দিয়ে দেহাতি বাচ্চাগুলোর দিকে ধেয়ে গেল এবং মিনিট খানেকের গোপন আলোচনার পরে এসে জানাল – ‘হয়ে গেছে’। আর ওর এই সাফল্যের ভবিষ্যৎ আন্দাজ করে আমাদের তিনজনের তখন সত্যিই হয়ে গেছে । চুপচাপ বাংলোতে পৌঁছে  ঘর দখল এবং সারগেই এর জিম্মায় সমস্ত খাবারদাবার এমন কী জ্যান্ত মুরগিটা পর্যন্ত (যেটা বড়াজামদা থেকে কেনা হয়েছিল এবং কুমডিতে এর দুই বন্ধু স্থানীয়কে ভক্ষণ করা হলেও একে খুঁজে পাওয়া যায় নি বলে বেঁচে গেছিল, পরে শান্তনু তাকে একটা পুরনো নোংরা কমোডের মধ্যে আবিষ্কার করে আর আমাদের প্রবল আপত্তি সত্তেও সাথে নিয়ে আসে কারণ রান্না হয়ে গেলে যে বিকট দুর্গন্ধটা এখন বেরচ্ছে সেটা নাকি আর থাকবে না) জমা দিয়ে তারপর মিনমিন করে শান্তনুকে আমাদের আতঙ্কের কথা জানালাম…… ময়ূর যে জাতীয় পাখি এবং ময়ূর মারা যে নিষিদ্ধ , খাওয়ার চিন্তা তো দুর …ধরা পরলে জেলে যেতে হতে পারে ইত্যাদি … আর এসব শুনেই প্রচণ্ড রেগে শান্তনুদর উপরোক্ত উক্তি আর গট গট করে বেরিয়ে যাওয়া। ওটা নাকি কোন এক  আদিবাসর পোষা ময়ূর আর মাত্র ২০০ টাকাতেই সে সেটা বেচতে রাজি।

ও বেরিয়ে যেতে আমরা কেমন যেন থতমত হয়ে বসে রইলাম । সত্যি কি ও একটা ময়ূর নিয়ে আসবে? আর আমাদের সামনে রান্না করে খাবে? যদি ফরেস্ট গার্ড ধরে তাহলে কী হবে ছোকরার ….. এইসব ভাবতে ভাবতে দূরে জঙ্গলে ঢাকা পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে বসে রইলাম আমরা । সারান্ডা মানে সাতশো পাহাড়ের দেশ । পুরো জঙ্গলটাই পাহাড়  ঘেরা …… মাঝে মাঝে পাহারি ঝরনা … কিরিবুরু আর মেঘাতিবুরু থেকে ঢেউ এর মতো পাহারের সারি খুব সুন্দর দেখা যায় …… একটু আগেই এই রেঞ্জের সবচেয়ে উঁচু ঝরনা টোয়েবু ফলস্‌ দেখে এসেছি …. সেখানে ঝর্নার জল থেকে তৈরি ছোট্ট নদী থেকে বেশ কিছু কুচো চিংড়ি আর ছোট কাঁকরা ধরে জ্যাকেটের পকেটে পু্রেওছিলাম আমরা, রাতে ভেজে খাওয়া হবে বলে … স্থানীয় কিছু আদিবাসীর আপত্তিতে (‘ইধার দেও কা শাপ হ্যায়, ইয়ে খানেসে মর জায়েঙ্গে আপ লোগ’ ইত্যাদি) তাদের আবার নদীতেই ছেড়ে দিই ……  এই জঙ্গলে বেড়াতে এসেই নাকি বাঘের ডাক শুনে মিঠুদা হোমিওপ্যাথিক ওষুধ এর শিশি খুলে গোটা কয়েক বড়ি খেয়েছিল। আগে এই নিয়ে বেজায় হাসাহাসি করলেও এখন জঙ্গলের বাহার দেখে মনে হচ্ছে খুব একটা গাঁজাখুরি ছিল না বোধহয় গপ্পোটা । এদিকে বাকিদের অবস্থাও বেশ খারাপ । চিন্টু, যে কিনা চাইবাসা থেকে  এখানে আসার পথে অত সাধের হ্যাটটা চোখের সামনে মাথা থেকে খুলে হাওয়ায় উড়ে যেতে দেখেও দু এক বার খুঁতখুঁত করা ছাড়া সেরকম কিছু বলে নি সেও কিরকম গোল চোখ করে তাকিয়ে আছে দেখলাম …… আর আমাদের দোর্দণ্ডপ্রতাপ ডনি ওরফে সুবিত, যে চৌকিদার এর অনুপস্থিতিতে তার চিনি দিয়ে খাসা পেঁপের চাটনি বানিয়ে আমাদের খাইয়েছিল আর পরে সেই চৌকিদারকেই ‘হাম কানুন কা আদমি (তখন ওকালতি পড়ছিল  কিনা) হ্যায় ট্যায়’ বলে হেব্বি চোটপাট  করেছিল সেও কিঞ্চিৎ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে বলেই মনে হল ……  এদিকে ঘণ্টা দুই কেটে গেছে , সন্ধ্যা নেমেছে জঙ্গল জুড়ে … আর সেই সঙ্গে বিহারের প্রচণ্ড ঠাণ্ডা … আমরা তো গায়ে সোয়েটার , জ্যাকেট সব চাপিয়ে নিয়েছি …  কিন্তু সে হতচ্ছাড়া তো দুপুরবেলা একটা পাতলা শার্ট গায়ে দিয়েই বেরিয়েছিল …… আর আসছে নাই বা কেন ? এতক্ষণ তো লাগার কথা না …………

৩ ঘণ্টা ………  এবার সত্যি চিন্তা হচ্ছে … এই ঘুটঘুটে অন্ধকারে ঘন শ্বাপদসঙ্কুল বনে কিভাবে ওকে খুঁজব জানি না … কিন্তু আর দেরি করা যায় না … আমরা তৈরি হয়ে নিলাম … চৌকিদার এর থেকে দুটো টাঙ্গিও জোগাড় হল … সদলবলে যখন বেরতে যাব ঠিক তখনি  ভয়ংকর গম্ভীর মুখে শান্তনুর আগমন, সারা গায়ে মাথায় ধুলো , জামাটা ছেঁড়া, রীতিমতো বিধ্বস্ত … তবে ধড়ে প্রাণ এলো দেখে যে সাথে জীবিত বা মৃত কোন ময়ূর নেই …

প্রায় এক ঘণ্টা ওকে একা থাকতে দিয়ে অবশেষে আমরা আর থাকতে না পেরে ওর কাছে গিয়ে খুব মোলায়েম গলায় বললাম ‘ ময়ূরের কী হল রে ?’  ভেবেছিলাম খিঁচিয়ে উঠবে কিন্তু একটু থেমে যা বলল সে বড় হৃদয় বিদারক কাহিনি …… বেচারা খুঁজে পেতে ময়ূর এর মালিককে পাকড়াও করে এবং তাকে ২০০ টাকা দিয়ে পাখিটির ওপর নিজের মালিকানাও নিশ্চিত করে … তারপরেই সেই ভয়ঙ্কর কান্ড টি ঘটে ……  মালিক তার দেহাতি হিন্দি তে যা বলে তার মর্মার্থ হল  ‘ যান , এবার ধরে নিন ’  ……

ঘটনা চক্রে ময়ূরটি আদৌ পোষা ছিল না … মুরগি গুলোর সাথে ঘুরে বেড়াত অল্প আয়াসে দানাপানি পেত বলে …… এদিকে  শান্তনু  ভেবেছিল ময়ূর ধরা এমন কী আর শক্ত … খুব একটা উড়তে পারে বলেও তো মনে হয় না । গিয়ে পাকড়াও করলেই হল … একটু ভুলই ভেবে ফেলেছিল বেচারা … প্রথমবার একটু অবজ্ঞার সাথেই খপ করে ধরতে গেছিল ব্যাটাকে … কিন্তু জাতীয় পক্ষী ঠিক শেষ মুহূর্তে হালকা উড়াল দিয়ে ফুট চারেক দূরে গিয়ে বসল …  এবার কিঞ্চিৎ সতর্ক শান্তনু তীব্র বেগে ঝাঁপ দিয়ে পড়ে টার্গেট এর ওপর …… আবার হালকা একটা উড়াল …… আর প্রচণ্ড শব্দে শান্তনুর ভূমিশয্যা …… শুরু হয়ে গেছিল শান্তনু আর ময়ূর এর অসম লড়াই … প্রতিবার আগের চেয়ে আরেকটু সতর্ক শান্তনু ঝাঁপ দেয় আর ময়ূর খুব সামান্য একটু উড়ে মাত্র ফুট চারেক দূরে গিয়ে বসে । আস্তে আস্তে আমাদের নায়কের সারা শরীর ধুলোয় মাখামাখি হয়ে যায় … জামাটা শতছিন্ন হয়ে পড়ে … দুই হাঁটু আর কনুই ছড়ে যায় …. কেমন যেন বিধ্বস্ত হয়ে পড়তে থাকে … তাও হতোদ্যম না হয়ে লড়ে যাচ্ছিল টানা দুই ঘণ্টা … কিন্তু বাদ সাধল অন্ধকার । সন্ধ্যা নামার পরেই সেই নরাধম (অবশ্য শান্তনুর তাকে সেই মুহুর্তে নরের চেয়ে ঢের উত্তমই মনে হচ্ছিলো) পক্ষী গোটা তিনেক তার সেই বিখ্যাত চার ফুটিয়া লাফ দিয়ে অন্ধকারের মধ্যে কোথায় যেন মিলিয়ে গেল , ঠিক যেমন তার তথাকথিত মালিকটি ২০০ টাকা হাতে পেয়েই মিলিয়ে গেছিল ………

গভীর রাতে হঠাৎ ঘুমটা ভেঙ্গে গেল ……  শান্তনুকে অনেক সান্তনা দিয়ে সবাই মিলে পেট ভরে মুরগির ঝোল খেয়ে ঘুমোচ্ছিলাম … ওয়াচ টাওয়ারে রাত কাটানো আগামিকাল হবে …… হঠাৎ খড়মড় করে একটা আওয়াজ শুনে সবাই উঠে পড়লাম …… সবাই উৎকণ্ঠিত … কিন্তু শান্তনু অত্যন্ত বিরক্তি ভরে জ্যাকেটের পকেট থেকে একটা পেল্লায় কাঁকরা বার করে ফেলে দিতে দিতে বলল – ‘ সেই টোয়েবু ফলস্‌ এ এগুলোকে পকেটে ভরেছিলাম , ফেলেও তো দিলাম …… এ ব্যাটা দেখছি এখনো রয়ে গেছিল, যত্তসব …’ । বলে আমাদের হতভম্ব চোখের সামনে নির্বিকার চিত্তে শুয়ে পড়ল এবং কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে নাকও ডাকতে লাগলো ।

আর পরদিন রাত্তিরে থলকোবাদ  ওয়াচ টাওয়ার এ সারা রাত কী হয়েছিল ? সে এক অন্য গল্প ……।।

Latest posts by প্রিয়ঙ্কর চক্রবর্তী (see all)