সারা ইন্টারনেট খুঁজলে কয়েক হাজার রান্না-বান্না সংক্রান্ত ব্লগ বা ওয়েবসাইট দেখতে পাওয়া যাবে। তার মধ্যে বাংলাতে লেখা ব্লগের সংখ্যাও কম নয়। আর রান্না? একবার যেকোন একটা রান্নার রেসিপির খোঁজ করে দেখুন না!  দিশি-বিলিতি-উচ্চবিত্ত-মধ্যবিত্ত-ট্র্যাডিশন-ফিউশন- যে কোন রান্নার অন্তত সাড়ে সাতাত্তরখানা রেসিপি পেয়ে যাবেন ! যদি জিজ্ঞেস করেন -“সাড়ে”টা কেন? ওটা হল, সেইসব ব্লগকে বোঝাতে, যাদের মালিকেরা নিজেরা কিছু লেখেন না, কেবলমাত্র এইব্লগ-সেইব্লগ থেকে রেসিপি এর লিঙ্ক এনে নিজের ব্লগে রাখেন (অনেক সময়ে অবশ্য অন্যের ব্লগ থেকে বেমালুম পুরো রেসিপিটা ঝেড়েও দেন !) আর ওই বাকি সাতাত্তরখানার মধ্যে যেটুকু তফাত, তা হল- কেউ বলেছেন তিনচামচ লঙ্কাবাটা, তো কেউ বলেছেন তিনখানা লঙ্কাকুচি, কেউ বলেছেন বোনলেস, কেউ বলেছেন বোন-ইয়েস!! সে যাকগে, মোদ্দা কথা হল, আর রেসিপি লিখে লাভ নেই। ব্যাপারটা ওই কোন যেন এক তাত্বিক বলেছিলেন- “আর গল্প লিখে কি হবে, সব গল্পই তো লেখা হয়ে গেছে…”- ওই গোছের। যাই লিখতে যান, কেউ না কেউ, কোথাও না কোথাও লিখে রেখে গেছে। তাই ঠিক করলাম, খাবারের রেসিপি নয়, খাওয়াদাওয়ার গল্পই করি বরং।

শীতকাল তো শেষ হয়ে গেল। অন্ততঃ কলকাতায় তো শেষ হয়ে গেল প্রায়। এখন বেশ ফুরফুরে দখিণা বাতাস দিচ্ছে, না ঠাণ্ডা-না গরম ভাব। এই সুখ অবশ্য আর বেশিদিন থাকবে না। ঠিক যেমন থাকবে না শীতের সবজি খাওয়ার আনন্দ। ফুলকপি ভাজা, বেগুণ পোড়া, বিট-গাজরের স্যালাড…আহা…ভেবেও সুখ !

তা এই সুখের সন্ধানে শীতকাল জুড়েই নানারকমের শাক সবজি কিনে এন্তার খেতেই থাকি। শীতে আমার প্রিয় খাদ্যগুলির মধ্যে বেগুণ পোড়া আর বেগুণ ভর্তা- দুই-ই খুব পছন্দের খাবার। দুটোকেই রুটি বা ভাত, দুই দিয়েই খাওয়া চলে। তবে অনেকদিন ধরে মনে মনে বেগুণপোড়া দিয়ে আরেকটা বস্তু খাওয়ার ইচ্ছা ছিল। সেটা এবার একদিন খেয়ে দেখেছি, এবং , বলতে দ্বিধা নেই, খুব আনন্দ হয়েছে। সেটা কি, সেটা বলছি, তার আগে একটা ছোট্ট মুখবন্ধ।

বেশ কয়েক বছর আগে একটা গল্প পড়েছিলাম। কোন পত্রিকা, নাকি বই, কে লেখক, গল্পের নাম কি, গল্পের রূপরেখা কি, প্রেমের না ভূতের, কিচ্ছু মনে নেই! যা মনে আছে, সেটুকু হল এইরকম- সেই গল্প ছিল কোন এক একাকী বৃদ্ধার স্মৃতিচারণ। তিনি নিজের সংসার জীবনের কথা মনে করছেন। জমজমাট শ্বশুরবাড়ি ছিল তাঁর- যেমন হয়ে থাকত সেই সব কোন এক কালে…শ্বশুর-শ্বাশুড়ি-দেওর-ভাসুর-জা ইত্যাদি প্রভৃতি। বাড়ির চার বৌএর সারাদিন কেটে যেত শুধু সারাবাড়ির লোকজনের চারবেলার খাবার যোগান দিতে দিতে। ঠিক যেমন হয়েই থাকত (এখনো হয় কোন কোন পরিবারে) বাড়ির ছেলেরা আগে খেতে বসত । বাকিরা কে কি খেতে পাচ্ছে বা পাবে সেই নিয়ে তাদের কোন মাথাব্যাথা ছিল না। তাদের চর্ব -চোষ্য পেট পুরে খাইয়ে, তারপরে বাচ্চা-বুড়ো-চাকর-ঝি ইত্যাদিদের খাওয়ার ব্যবস্থা করতে করতে একেকদিন দেখা যেত, বাড়ির চার বৌ-এর খাওয়ার মত আর কিছু বাকি পড়ে নেই। তখন আবার ভাত বসাও, দুটো আলুসেদ্ধ দিয়ে… কোন কোন হু হু ঠাণ্ডা শীতের রাতে তাদের আর সেটাও করতে ইচ্ছা করত না। তখন শেষ উনুনের আঁচে, গোটা তিন-চারেক বেগুণ পুড়িয়ে নিত তারা। তারপরে একটু তেল-লঙ্কা দিয়ে মেখে সেই বেগুণপোড়া খেত মুড়ি দিয়ে! সে স্বাদ নাকি অমৃতের মত, যে একবার খাবে সে আর ভুলবে না।

সেই যে পড়েছিলাম- সেই থেকে আমার মনে মনে প্রবল শখ ছিল- এই খাওয়াটা একবার খেয়ে দেখতে হবে। কিন্তু গত এক যুগেরও বেশি সময়ে সেটা আর করা হয়ে ওঠেনি। এখানে একটা কথা বলে নিই- এই অবধি পড়ে আমার সাহিত্যপ্রীতি সম্পর্কে যদি আপনি যথেষ্ট সন্দিহান হন (হতেই পারেন- গল্পের নাম, লেখকের নাম মনে নেই, অথচ মুড়ি-বেগুণপোড়া মনে আছে !!)- তাহলে বলি, আমি বাপু ভাল গল্প উপন্যাসের মর্ম একটু আধটু হলেও বুঝি, আর অতটাও পেটুক নই। তবে হ্যাঁ, ভাল খাবার -দাবার সম্পর্কে আমার উৎসাহ আছে, আর আমি যে খেতে ভালবাসি সেটা সবাইকে জানাতে আমার কোন প্রচলিত নারীসুলভ লজ্জ্বা-দ্বিধা নেই (থাকতে হয় বলে শুনেছি, তাই বললাম)। আর কোন গল্পে যদি খাবারের কথা বিস্তারিত লেখা থাকে, তাহলে সেটা পড়তে আমি খুব পছন্দ করি।

এবার যা বলছিলাম তাতে ফিরে আসি। আমি, এই এতদিনে, এই শীতে, অবশেষে, সেই কাজটি করতে পেরেছি। মুড়ি দিয়ে টাটকা বেগুণপোড়া খেতে পেরেছি। এবং খেয়ে বলছি- এই অভিজ্ঞতা সবার একবার নেওয়া উচিত (যদি বেগুণে অ্যালার্জি না থাকে)! ব্যাপারটা তৈরি করাও খুব একটা ঝামেলার বা সময়সাপেক্ষ নয়। বেগুণ পোড়ানোটাতে খানিকটা সময় যায়- মিনিট দশ-পনেরোর মত। কিন্তু সেই সময়ে বাকি জিনিষগুলোকে গুছিয়ে ফেলুন। কুচিকুচি করে কেটে নিন পেঁয়াজ, টমেটো, কাঁচালঙ্কা, আদা, ধনেপাতা। অল্প ক্যাপসিকামও নিতে পারেন। এক মুঠো টাটকা মটরশুঁটি ধুয়ে রেখে দিন। আর হ্যাঁ, রসুন ও দিতে পারেন কুচি করে, অথবা উত্তর ভারতের নিয়মে বেগুণের গা চিরে তার মধ্যে গুঁজে দিন রসুনের কোয়া। বেগুনের সাথেই ঝলসিয়ে যাবে। কাঁচা গন্ধটা আর থাকবে না। তারপরে আর কি। বেগুণ একটু ঠাণ্ডা হলে, একটা বড় পাত্রে রেখে পোড়া খোসা ছাড়িয়ে নিন। সব কাঁচা সবজি মেশান। তারপরে সেই সব্জি-সজ্জিত পোড়া বেগুণকে (অথবা বেগুণগুলিকে ) বেশ খানিকটা সর্ষের তেল এবং আন্দাজমত নুন দিয়ে ভাল করে মেখে ফেলুন। এরপরে, ঠিক যখন খেতে ইচ্ছা করবে, একবাটি মুড়ির সাথে ভাল করে মেখে খেয়ে ফেলুন । রাতের খাবার হিসাবে খেতে না ইচ্ছা হলে, সন্ধ্যেবেলার জলখাবার হিসাবে খেয়ে দেখুন। খেতে হলে সামনের কদিনের মধ্যেই খান, গ্রীষ্মের বীজভর্তি বেগুণ পোড়া হিসাবে খাওয়ার অযোগ্য।

আদ্যন্ত বাঙালির মত হাত দিয়েই খান, আঙুল চেটে চেটে। সায়েবি কায়দায় আবার ফর্ক-স্পুন দিয়ে খাওয়ার চেষ্টা করবেন না। আমেজটাই মাঠে মারা যাবে।