কাদের মোল্লা বা কসাই কাদেরের ফাঁসির আগে বেশ কিছু নাটক হয়ে গেল বাংলাদেশে। সাম্প্রদায়িক শক্তি বিশেষ করে জামাত ই ইসলামির বাড়বাড়ন্তই এর কারণ। ইতিহাস বা এই সময়ে বিভিন্ন ইসলামি দেশ গুলির দিকে তাকালে দেখা যাবে ধর্ম এখানে রাষ্ট্র ব্যবস্থায় বেশ ভালরকম হস্তক্ষেপ করতে উদ্যত। বাংলাদেশের শাহবাগ আন্দোলন এই ধর্মের আফিমের বিরুদ্ধে যেভাবে গর্জে উঠেছিল তা এক ইসলামিক রাষ্ট্রের মানসিকতা থেকে বাংলাদেশকে মুক্তি দিয়েছে। তারপরে বেড়েছে জামাতের অসভ্যতা।

কিন্তু এত কিছু করেও কসাই কাদেরের ফাঁসি আটকানো যায় নি। যদিও একটা মহল থেকে সুকৌশলে প্রচার হয়ে চলেছিল এই কাদেরই সেই কসাই কাদের নয়। একাত্তরের সেই দুর্বিষহ সময়ে ধর্ষণে নেতৃত্বদানকারী, বুদ্ধিজীবী হত্যাকারী, হাজার হাজার বাঙালিকে খুন করা পাকিস্তানের সমর্থক কসাই কাদের আদতে নাকি জামাত ইসলামির নেতা নন। কিন্তু কাদের মোল্লার ফাঁসির পর পাকিস্তান পার্লামেন্টে শোকপ্রস্তাব এবং বিভিন্ন পাক নেতার শোক দেখে এটা বোঝাই গেছে “মরিয়াই তিনি প্রমাণ করিলেন তিনিই সেই কাদের মোল্লা”।

এই স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় যারা বাঙালি রাষ্ট্রের বিরোধিতা করেছিল এবং পাকিস্তানের সমর্থনের নামে যারা বাঙালির বিরোধিতা করেছিল, তাদের দমনের নামে ধর্ষণ খুন নির্বিচারে করেছিল, তাদের প্রতি বিরোধী দলের এই সহানুভূতি কেন? আদতে উপমহাদেশে রাজনৈতিক দলগুলির যেন তেন প্রকারেণ ক্ষমতায় যাওয়াটা একটা গভীর ব্যধি। যার জন্য এরা নীতি নৈতিকতার ধার ধারেনা।

ওপর ওপর দিয়ে যে প্রচারটা চলে সেটা হল জামাতি ইসলামি “নরম পন্থী” একটা সাম্প্রদায়িক দল। আসলে সেটা কাজ করে তৃণমূল স্তরে। একেবারে ছোটবেলা থেকে গ্রামে মফস্বলে শুরু হয় ধর্ম শিক্ষার নামে ব্রেইন ওয়াশ। সুকৌশলে সেখানে চলে ঈশ্বরের নামে দেশ চালানোর শিক্ষা। বিজ্ঞান যেখানে প্রবেশ করতে পারে না কোনভাবেই। এই ধর্মের ব্যবসা হল এখন সব থেকে লাভ জনক ব্যবসা। এর কোন “রিসেশন” হয় না। বরং রিসেশনের সময়েই এর বাড়াবাড়ি সব থেকে বেশি পরিমাণে দেখতে পাওয়া যায়। যে জায়গাগুলিতে এখনো রাস্তা হয় নি, শিক্ষার আলো সঠিকভাবে পৌঁছায়নি সেই কোণগুলিতে এই শক্তিগুলি খুব সহজে অপারেট করে। যার ফলে স্পর্শকাতর জায়গাগুলিতে এরা খুব সহজে পৌঁছে যেতে পারে। এদের অপারেশন বলতে ছুতো নাতা পেলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ঘর জ্বালিয়ে নিজের বীরত্ব প্রকাশ করা।

রাস্তা কেটে রাখা, বাস জ্বালিয়ে দেওয়া, দিনের পর দিন মূল সড়ক অবরোধ করে রাখা, নিত্ত নৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশে। এর ফলে স্বাভাবিক জনজীবন যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি শুরু হয়ে গেছে এক বিচিত্র মাৎস্যন্যায়। কালোবাজারি বৃদ্ধি পাচ্ছে, জিনিসের দাম হয়ে উঠছে আকাশছোঁয়া, রাস্তা ঘাটে বেরোলে সাধারন মানুষ নিশ্চয়তা পাচ্ছেন না যে তারা ঘরে ফিরবেনই- সব মিলিয়ে রাষ্ট্র বিরোধী বিপ্লবের নামে জামাতবাহিনী যে কাজটা শুরু করেছে সেটা আসলে এই নরম পন্থার নামে সাম্প্রদায়িক শক্তির তুমুল শক্তিপ্রদর্শন। এবং এই জায়গাতেই প্রশ্ন উঠে যায়, সাম্প্রদায়িক শক্তির আবার “নরমগরম” হয় নাকি?

এবার আসা যাক সরকারি দল বা শাসক দলের ভূমিকায়। তারা কি রাজধর্ম পালন করছে? কঠিন হাতে দমন করতে পেরেছে এইসব অসভ্যতা? তাদের কাজ কঠিন থেকে কঠিন তর হয়ে যাচ্ছে দিনে দিনে। তাদের বিরুদ্ধেও উঠতে শুরু করেছে “যেন তেন প্রকারেণ ক্ষমতায় টিকে থাকার চেষ্টা”র অভিযোগ। সুতরাং সাধারন জনগণ পড়েছেন মহা আতান্তরে।

এবার প্রশ্ন হল বাংলাদেশ আসলে কি সত্যিই ধর্মের কারাগার থেকে মুক্ত হতে পেরেছে? এখনো তবে অধিকাংশ মানুষ কেন কাদের মোল্লার সমর্থনে মিছিল করছেন? আদতে কি তারা সত্যিই চান পাকিস্তানের ছত্রছায়াতেই থাকতে? “বাংলাস্তান”ই কি তাহলে ভবিষ্যৎ? নাকি শিক্ষা ও উন্নয়নের আলোয় আলোকিত শাহবাগ আন্দোলন এক নতুন অসাম্প্রদায়িক উন্নত বাংলার পথ দেখাবে?

এই উত্তরগুলির দিকেই আপাতত তাকিয়ে আছে বহির্বিশ্ব।


Latest posts by অভীক দত্ত (see all)