ফিল্ম    রিভিউ : চাঁদের পাহাড় ( The Mountain Of Moon )
মূল কাহিনী : বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
পরিচালনা : কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়
রিলিজ : ২০শে ডিসেম্বর ২০১৩
দৈর্ঘ্য : ১৪৮ মিনিট


আজ যখন “চাঁদের পাহাড়” দেখতে যাচ্ছিলাম, তখন সত্যি বলতে কি মনের মধ্যে আশার চেয়ে আশঙ্কাই বেশী ছিল। এর আগে যতখানি আশা এবং উদ্দীপনা নিয়ে “মিশর রহস্য” দেখতে গিয়েছিলাম ঠিক ততখানি-ই বিমর্ষ এবং ভগ্নমনোরথ হয়ে ফিরতে হয়েছিল। তাই এবার যাকে বলে একেবারে আগে থেকেই বেশ তৈরি হয়ে ছিলাম। বিভূতিভূষণের এই বিখ্যাত ক্লাসিক জীবনে একবার-ও পড়েননি এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া বেশ শক্ত এবং পড়ে নিজেকে একবার-ও  গল্পের নায়ক শঙ্করের জায়গায় কল্পনা করেননি এমন মানুষ-ও বোধহয় বিরল। এরকম একটি কাহিনী নিয়ে যখন কোন পরিচালক ছবি বানাতে বসেন তখন স্বাভাবিকভাবেই তাঁর ওপর মানুষের প্রত্যাশার চাপ একটু বেশীই থাকে, কমলেশ্বরবাবুর ওপরেও ছিল। তাঁর পরিচালিত “মেঘে ঢাকা তারা” কিন্তু জানান দিয়েছিল যে তিনি অন্য জাতের পরিচালক। তাই হয়তো শ্রী ভেঙ্কটেশ ফিল্মস্‌ অনায়াসেই তাঁর ওপর ভরসা করতে পেরেছে এবং প্রযোজনার ক্ষেত্রে কোনরকম কার্পণ্য না থাকার ফলে এটিই এখনো অবধি টলিউডের সবচেয়ে বেশী বাজেটের ছবি ( ১৫ কোটি ) ।

শঙ্করের চরিত্রে দেব কে ভাবাও বেশ সাহসী পদক্ষেপ । দেব এমন একজন নায়ক বাংলা ছায়াছবির জগতে যিনি অসীম জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও শিক্ষিত আরবান বাংগালীর কাছে কোনদিন-ই সেভাবে ‘নায়ক’ হয়ে উঠতে পারেননি। তাঁর বাংলা উচ্চারণের জড়তা এর প্রধান কারণ । কিন্তু এই ছবি দেব কে নতুন ভাবে চিনিয়েছে…হাজার ম্যানারিজ্‌ম থাকলেও এখানে দেব যথেষ্ট পরিণত। বিশেষ করে শেষের দিকে তাঁর অভিনয় থেকে এটা পরিষ্কার যে এই চরিত্রের জন্য তিনি ভেবেছেন…সময় দিয়েছেন।  আর দেবেন নাই-ই বা কেন ! শঙ্কর চরিত্রটি যেকোন নায়কের-ই স্বপ্নের চরিত্র । গ্রামের ছেলে শঙ্কর গাছ বাইতে , নৌকা চড়তে ওস্তাদ , খেলাধূলায় পারদর্শী । কিন্তু এই বাংলা মায়ের আঁচলে সে বন্দী হতে চায়না , সে চায় দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়াতে , অভিযাত্রী হয়ে নিত্য-নতুন  আবিষ্কারের স্বপ্ন তার চোখে । তাই একদিন সে পাড়ি দ্যায় আফ্রিকা …একটি অখ্যাত স্টেশনের স্টেশনমাস্টার হিসেবে কাজ করতে করতে সে বোঝে কেন আফ্রিকা একাধারে ভয়ংকর এবং সুন্দর। সিংহের সাথে দৈনন্দিন সাক্ষাৎ ঘটতে পারে এখানে  , আর আছে নিশ্চিত  যমদূত , সাপ !  কিন্তু শঙ্কর এই জীবন-ই চেয়েছিল তাই কোন কিছুই তাকে দমাতে পারেনি । এইভাবেই একদিন ঘটনাক্রমে তার সঙ্গে পরিচয় হয় ডিয়েগো আল ভারেজ নামে এক পর্তুগীজ অভিযাত্রীর…যাকে সে প্রায় মরণাপন্ন অবস্থায় উদ্ধার করে এবং তার শুশ্রূষায় সে ক্রমে সুস্থ হয়ে ওঠে ।  আলভারেজের কাছে শঙ্কর শোনে এক আশ্চর্য কাহিনী …এক হিরের খনির গল্প…যা আছে তৎকালীন আফ্রিকার সর্বাপেক্ষা দুর্গম পর্বতশ্রেণী রিখ্‌টারস্‌ভেল্ড অঞ্চলে । তারপর যাঁরা পড়েছেন তাঁরা ত অবশ্যই জানেন আর যাঁরা জানেননা তাঁদের জন্য শেষের রোমাঞ্চটুকু রইলো ।

যেটা বলার তা হল শঙ্করের চরিত্রে এ-ছবির প্রধান  আকর্ষণ ( বা মতান্তরে বিকর্ষণ ) দেব কে মোটামুটি ভাবে  মানিয়ে নেওয়া গেছে। হ্যাঁ , অবশ্যই কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাঁর জড়তা স্পষ্ট , কোন কোন সময় তাঁকে বেশ ‘হি-ম্যান’ টাইপ মনে হয় ( যখন তিনি প্রাণপণে সিংহ র সাথে রেস লাগান বা ” এই দ্যাখ্‌ সিগারেট্‌ খেতে খেতে ক্যামন এভারেস্টে উঠছি কিন্তু কোন গর্ব নেই ” ধরণের একটা মুখভঙ্গি করে ‘বুনিপ – বধ’ করেন ), অথবা আলভারেজ যখন শঙ্কর কে বলছে ” টোমাড় রক্তে ডুঃসাহস আছে ” তখন দেব যেভাবে ”ধ্যাত” বলেন ত্যামনভাবে সদ্যবিবাহিতা বাঙালি তরুণীও স্বামীকে ‘ অসভ্য ‘ বলেনা ।

কিন্তু ওই যে আগেই বললাম , তিনি যথাসম্ভব চেষ্টা করেছেন এবং সেখানে তাঁকে নম্বর না দিয়ে উপায় নেই । এমনিতে দেব কে দেখলেই ক্যানো জানি আমার ঠোঁট অটোমেটিক্যালি বেঁকে যায়…তার ওপর শঙ্কর এর চরিত্রে রয়েছে ভেবেই জাস্ট আতঙ্কিত হয়েছিলাম । কিন্তু দূরতম কল্পনাতেও ভাবতে পারিনি যে বেরিয়ে এসে আমি-ই বলবো ‘ নাঃ , দেব যথেষ্ট ভালো অ্যাক্টো করার চেষ্টা অন্ততঃ করেছে এবং খুব যে অসফল তা বলা যায়না ‘…বরং বেশ ভালোই লেগেছে বেশ কিছু দৃশ্যে ।  আলভারেজের চরিত্রে Gérard Rudolf সম্বন্ধে কিছু বলার নেই ! অসাধারণ তাঁর অভিব্যাক্তি এবং  অভিনয় দক্ষতা ! বস্তুত ,এনার জন্যেই শঙ্কর চরিত্রের বেশ কিছু খামতি ঢাকা পড়ে গেছে । মার্টিন সিটো ওটো ( জিম কার্টার ) লাবণী সরকার ( শঙ্করের মা ) এবং তমাল রায়চৌধুরির অভিনয় যথাযথ ।  সুরকার ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্ত এবং দেবজ্যোতি মিশ্র আফ্রিকার উপযোগী আবহ-সংগীত রচনা করেছেন এবং তা কখনোই জগঝম্প বলে বোধ হয়নি । বেশ বড়সড় ধন্যবাদ প্রাপ্য চিত্রগ্রাহক সৌমিক হালদারের, বেশ কিছু দৃশ্যে ক্যামেরার ব্যবহার অতুলনীয় । রবিরঞ্জন মৈত্রের সম্পাদনাও মুনশিয়ানার দাবী রাখে । আগ্নেয়গিরির সিকোয়েন্স বাংলা ছবিতে মোটামুটি বিশ্বাসযোগ্য ভাবে যে দ্যাখানো যেতে পারে তা এনারা  করে দেখিয়েছেন ( আপনি নিশ্চয়ই হলিউডের সঙ্গে তুলনা টানবেননা কারণ সেক্ষেত্রে হতাশ হবেন এবং অকারণ ও অনাবশ্যক আঁতলামির জন্য খিস্তিও খেতে পারেন ) ।

পরিশেষে বলি , কোন ক্রিয়েটিভ কাজ-ই ১০০% পারফেক্ট নয় এবং এটি তো নয়-ই । তবুও পরিচালক কে কুর্নিশ এই ছবিটির জন্য । যে যত্ন এবং মনোযোগ দিয়ে তিনি এ ছবি বানিয়েছেন তা অবশ্যই প্রশংসাযোগ্য । ছবির প্রয়োজনে মূল কাহিনীকে কোথাও কোথাও বদলাতে হয় , এখানেও হয়েছে , কিন্তু খাপছাড়া লাগেনি । একমাত্র যে জিনিসটি বেশ ইয়ে…মানে উদ্ভট মনে হয়েছে তা হল ‘বুনিপ’ শিকার ! ক্লান্ত, অবসন্ন শঙ্কর ওই প্রাণীটিকে মারার চাপ হঠাত যে ক্যানো নিতে গ্যালো তা আমি অন্ততঃ বুঝিনি । সম্ভবত প্রতিশোধস্পৃহা ( তুই আমার মা-কে বিধবা করেছিস , আমার বোন কে রাস্তায় দেখে আওয়াজ দিয়েছিস …আঁমি তোঁকে ছাঁড়বোঁনাআআআআআ )।

বুনিপ নামক প্রাণীটিকে মূল কাহিনীতে কোথাও সরাসরি দেখতে পাওয়া যায়না , শুধু তার অস্তিত্ব অনুভূত হয় । পরিচালক কিন্তু বুনিপের চেহারা দেখিয়েছেন মূল কাহিনী অনুসরণ করেই । গল্পের শেষে শঙ্কর যখন অদেখা  প্রাণীটির বিবরণ দিয়ে সাউথ রোডিসিয়ান মিউজিয়ামের কিউরেটর ডক্টর ফিটজেরাল্ডের সঙ্গে দেখা করেছিল তার পরে তিনি চিঠিতে জানান যে ” …the monster you saw was nothing more than a species of anthropoid ape , closely related to the gorilla , but much bigger in size and more savage…”.

সামান্য শীতের আমেজ গায়ে মেখে অতএব , একবার দেখেই আসতে পারেন ” চাঁদের  পাহাড় ” … তিন নম্বর ধূম দেখে মাথা না ধরিয়ে নাহয় একবার না হয় এটাই দেখলেন ! বাঙ্গালী কে বাঙ্গালী না দেখিলে কে দেখিবে ইত্যাদি প্রভৃতি…।


Latest posts by মনিপর্ণা সেনগুপ্ত মজুমদার (see all)