রিলিজ : ২০১২

দৈর্ঘ্য : ১২৭ মিনিট

নির্দেশনা :  অ্যাং লি

অভিনয় :  আদিল হুসেন, জেরার্ড ডেপার্ডিউ, ইরফান খান, রেফ স্পল, শ্রাবন্তি সাইনাথ, সুরজ শর্মা, ট্যাবু

অস্কার : পরিচালনা, সিনেমাটোগ্রাফি, সঙ্গীত পরিচালনা এবং ভিস্যুয়াল এফেক্ট

মানুষ চাইলে সব কিছুই করতে পারে। “লাইফ অফ পাই” চলচ্চিত্রটি দেখার পরে এই কথাটাই সব থেকে বেশী করে মনে হয়। ইয়ান মার্টেল-এর লেখা গল্পের প্রধান চরিত্র পাই প্যাটেল ২২৭ দিন প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে কাটিয়েছিল। তাকে এই দিনগুলো কাটাতে হয়েছিল সামুদ্রিক ঝড়, হাঙর এবং একটি বাঘের সঙ্গে। এই ঘটনাও যেমন অবিশ্বাস্য রকমের কঠিন, আমার মনে হয় এমন একটা গল্পকে সিনেমার পর্দায়ে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলে ধরা ঠিক ততটাই কঠিন । নির্দেশক অ্যাং লি-র সাফল্য এখানেই যে তিনি এই আপাত অসাধ্যকে বাস্তবায়িত করেছেন। কাজেই শুধু চারটে অস্কার পেয়েছে বলে নয়, সিনেমাপ্রেমীদের কাছে অনেক অনেক উপাদানে ভরপুর ‘লাইফ-অফ-পাই’। প্রথমেই বলে রাখি লাইফ অফ পাই অনেকটাই কাহিনী নির্ভর। গল্পের গতি যেমন একের পর এক মোড় নিয়েছে, তেমনিই বদলেছে সিনেমার দৃশ্যপট। আর পুরো ব্যাপারটাই অসম্ভব রকমের উপভোগ্য – আর সেটা একেবারে নাম দেখানর মুহুর্ত থেকেই। কাজেই সিনেমার কথা লিখতে গিয়ে গল্পটা বলা খুব বেশি রকমের প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।

এই গল্পের প্রধান দুই চরিত্র ১৬ বছরের পাই প্যাটেল এবং রিচার্ড পার্কার নামক একটি রয়েল বেঙ্গল টাইগার। এই দুই চরিত্রেরই নামকরণের পেছনে রয়েছে অদ্ভুত দুটো ঘটনা। পাই-এর মামা বড় সাঁতারু ছিলেন – তিনি সারা পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াতেন আর যেখানেই যেতেন, সেখানের সুইমিং পুলে একচোট সাঁতার কেটে নিতেন। প্যারিসের পিসিন মলিটর সুইমিং পুলে সাঁতার কেটে তিনি এতটাই খুশি হন যে ভাগ্নের নামই রেখে দেন পিসিন মলিটর প্যাটেল। এদিকে সেই নাম ব্যবহার করাটা খুবই কঠিন হয়ে দাঁড়ায় পাই এর কাছে কারন বন্ধু থেকে মাস্টারমশাই সবাই তাকে “পিসিং” বলে খ্যাপাতে থাকে।  তখন সে অনেক কষ্টে তার নাম পিসিন থেকে ছোট করে পাই-এ পরিণত করে। অন্যদিকে, রিচার্ড পার্কার আদৌ বাঘের নাম ছিল না, ছিল শিকারির। যখন বাঘটি চিড়িয়াখানায় আসে, ভুলবশত শিকারি আর বাঘ-এর নাম অদল বদল হয়ে যায় । বাঘের নাম সেই থেকে রিচার্ড পার্কার। আমরা গোটা সিনেমাটাই দেখতে থাকি টুকরো টুকরো ফ্ল্যাশব্যাকে – যেখানে পাই তার এক লেখক বন্ধুকে তার জীবনের ঘটনা শোনাতে থাকে।

ফ্রেঞ্চ কলোনি পন্ডিচেরি-র বাসিন্দা ছিলেন পাই-এর বাবা মা। পাই-এর বাবা ছিলেন চিড়িয়াখানার মালিক । মা ছিলেন বটানির ছাত্রী। পাই অনেক ক্ষেত্রেই ছিল নির্ভীক এবং অনুসন্ধিৎসু প্রকৃতির। ভগবানকে বোঝার জন্যে পাই হিন্দু-মুসলিম- খ্রীশ্চান সমস্ত ধর্ম অনুসরণ করতে শুরু করেছিল। আরেকবার, বাঘের খাঁচার মধ্যে হাত ঢুকিয়ে তাকে খাওয়াতে গিয়ে প্রায়ে নিজের হাতটা খোয়াতে বসেছিল। তার বাবা যথাসময়ে এসে তাকে বাঁচিয়ে নেন এবং পাই-কে বোঝান যে মাংসাশী জন্তুরা কখনই মানুষের বন্ধু হতে পারে না। ক্রমে পাই বড় হতে থাকে । এক সময় তার এক বান্ধবীর সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্কও তৈরি হয়। কিন্তু ঠিক সেই সময়, কোনও এক কারণে পাই-এর বাবা সপরিবারে কানাডা যাবার সিদ্ধান্ত নেন এবং সেখানে চিড়িয়াখানার সমস্ত জন্তু বিক্রি করে নতুন এক জীবন শুরু করার কথা ভাবেন । পাই-এর ভারত না ছেড়ে যাবার আকুতি তার বাবার কানে যায় না এবং বাকি পশুদের সঙ্গে পাই-ও মানসিক ভাবে বন্দী হয়েই কানাডা-র উদ্দেশ্যে রওনা হয় এক মালবাহী জাহাজে।

একদিন মাঝরাতে যখন সবাই নিদ্রামগ্ন, মাঝ সমুদ্রে তখন ভয়ঙ্কর ঝড় ওঠে। পাই বুঝতে পেরে ঝড় দেখার জন্যে জাহাজের ডেকে চলে আসে। প্রলয়ঙ্কর ঝড় কে চ্যালেঞ্জ করার ভঙ্গীতে কোনও অজানা আনন্দে চিৎকার করতে থাকে অসীমের উদ্দেশ্যে। কিন্তু খানিক বাদেই ঝড়ের কাছে হার মানে জাহাজ। পাই জাহাজ-এর ডেকে ছিল বলে তাকে লাইফবোট-এ করে নামিয়ে দেয় জাহাজ-এর কর্মীরা। উথাল পাতাল সমুদ্রে পাই-এর চোখের সামনে তার পরিবার সমেত ডুবে যায় সেই মালবাহী জাহাজ, প্যাসিফিক-এর গভীরতম মারিয়ানা ট্রেঞ্চ-এ। তার সেই নৌকা-এ তার সঙ্গী হয় একটা জেব্রা, একটা হায়েনা, একটা ওরাং ওটাং এবং রিচার্ড পার্কার নামক সেই বাঘ।

এরপর শুরু হয় বেঁচে থাকার লড়াই। বাঘের হাত থেকে পাবার জন্যে পাই-কে লাইফবোট ছেড়ে নিজের জন্যে একটা ভাসমান ভেলা তৈরি করে নিতে হয়। কয়েক দিনের মধ্যেই বাকি জন্তুরা চলে যায় বাঘের পেটে। একের পর এক বিপদ ঘনিয়ে আসতে থাকে – কিন্তু অসীম ধৈর্য, সাহস আর বুদ্ধিমত্তা নেই পাই এক একটি সমস্যার সম্মুখীন হয়। পাই-এর একমাত্র সঙ্গী বলতে তখন ভয়ঙ্কর রিচার্ড পার্কার। বেঁচে থাকার তাগিদে তার থেকে দূরে থাকলেও তাকে ছাড়া কাটানোর কথাও ভাবতে পারেনা পাই। এক সময় বুঝতে পারে, হয়তো সে না থাকলে ওই সমুদ্রের মাঝে চরম একাকীত্বে পাই বাঁচবার আশাও ছেড়ে দিত। সমুদ্রযাত্রার ভিস্যুয়াল এফেক্ট অসামান্য। বিশেষ করে তিমি মাছ, জেলি ফিশ, উড়ুক্কু মাছ – আর খোদ রিচার্ড পার্কার নিজে সকলেই কিন্তু কম্পিউটার গ্রাফিক্সের সৃষ্টি।

এরপরের ঘটনা দর্শকদের জন্যেই রইল – কারন বেঁচে থাকার লড়াইয়ের গল্প শেষ হয় এক অভিনব মোড় নিয়ে। অভিনয়, আবহসঙ্গীত, সিনেমাটোগ্রাফি, ভিসুয়াল এফেক্টস্‌ সব দিকেই এই সিনেমা তাক লাগানোর মতন। ঝড়ে জাহাজ-ডুবির দৃশ্যটা অভাবনীয়। এ ছাড়াও বেশ কিছু অসামান্য দৃশ্য আছে যেগুলো খুব উঁচু মাপের শিল্পকর্ম বলা ভাল।  দিনের বিভিন্ন সময়ের সঙ্গে মানুষের মনের পরিবর্তন মিলিয়েছেন নির্দেশক। এক কল্পনার দ্বীপকে জ্যান্ত করে তুলেছেন অ্যাং লি ও তার টীম-ওয়ার্ক। ১৬ বছরের পাই প্যাটেল-এর চরিত্রে সুরাজ শার্মা অসাধারণ অভিনয় করেছে। পন্ডিচেরী থেকে জাহাজ ছেড়ে যাওয়ার দৃশ্যে, সব কিছু ছেড়ে, দেশ ছেড়ে চিরকালের মতন চলে যাওয়ার যে কষ্ট, টাবু ঐটুকু সময়ে সূক্ষ্ম অভিনয় দিয়ে তা জীবন্ত করে তুলেছেন পর্দায়। পাই-এর বাবার চরিত্রে আদিল হুসেন মন কাড়া।

 

Latest posts by ঋতম ব্যানার্জী (see all)