Prastar  Antorale_Aditi Bhattacharya

চৌবাতিয়া জায়গাটা সত্যিই সুন্দর। অনিমেষবাবুর কথা না শুনলে অনেক কিছুই মিস করতাম। অনিমেষবাবু আমাদের বহুদিনের প্রতিবেশী, একই পাড়ায় পাশাপাশি আমাদের দুজনের বাড়ি।রানীক্ষেতে একটা কাজে আসছি শুনে বলেছিলেন, “দিন কয়েকের ছুটি নিন। চৌবাতিয়া থেকে ঘুরে আসুন। কত লোক ঘুরে এল, শুধু আপনারই সময় হয় না। এবার যান, দেখে আসুন। বাগান টাগান আর বেশী দিন থাকবে না। বড়দার বয়স হয়ে গেছে, শরীরও ভালো যাচ্ছে না। আমরাই বলেছি এবার সব বিক্রি টিক্রি করে এদিকে চলে আসতে। কবে যাচ্ছেন বলুন আমি বড়দাকে ফোন করে দেব।”

অনিমেষবাবুর বাবা বহু বছর আগে চৌবাতিয়ায় একটা ছোটো আপেলের বাগান কিনেছিলেন। তেমন একটা কিছু ছিল না সেটা তখন। তাকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেখার মত একটা বাগানে পরিণত করেন অনিমেষবাবুর বড়দা অজিতেশবাবু। ভদ্রলোক বিয়েথা করেননি। সারা জীবন চৌবাতিয়ায় ওই বাগান নিয়েই পড়ে আছেন। অনিমেষবাবুর চেনা পরিচিত সবাই একবার না একবার ঘুরে এসেছে আর আপেল বাগানের সৌন্দর্য ও অজিতেশবাবুর আতিথেয়তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছে। শুধু আমারই যাওয়া হয় নি। তাই এবার আর সুযোগ নষ্ট না করাই স্থির করলাম। রানীক্ষেতে কাজ শেষ করে বিকেলেই রওনা দিলাম চৌবাতিয়ার উদ্দেশ্যে।

অনিমেষবাবুর ফোন আগেই পৌঁছেছিল, তাই আপ্যায়নে কোনো ত্রুটি হল না। অজিতেশবাবুকে দেখে বুঝতে অসুবিধে হয় না যে উনি অনিমেষবাবুর দাদা। চেহারার মিল স্পষ্ট।

ভদ্রলোক দেখলাম বেশ গম্ভীর এবং রাশভারী। কথা কম বলেন।

বললেন, “এসেছেন বলে খুব খুশী হয়েছি। আশা করি আপনার কোনো অসুবিধে হবে না এখানে। ইচ্ছে মতো থাকুন, ঘুরুন। রঘুবীরকে যখন চাইবেন সঙ্গে পাবেন। ওই আপনাকে সব ঘুরিয়ে দেখিয়ে দেবে। আমি বুড়ো মানুষ, শরীরটাও ঠিক ভালো যাচ্ছে না, তার ওপর বাগানের সব কাজকর্ম দেখাশোনা করা। আমি হয়ত অতটা সময় দিতে পারব না। কিন্তু আপনি কোনো সংকোচ করবেন না।”

বললেন বটে কিন্তু আমার মন যেন কেমন খচখচ করছিল ভাবছিলাম এভাবে এসে মানুষটাকে বিরক্ত করলাম না তো। তাছাড়া দিন দুয়েক যে থাকব বাইরে ঘোরাঘুরি ছাড়া বাড়িতেও তো সময় কাটাতে হবে, ভদ্রলোক খুব একটা মিশুকে নন বলেই মনে হচ্ছে। অবশ্য শারীরিক অসুস্থতার কারণেও হতে পারে। কিন্তু আমার সব চিন্তা দূর করে দিলেন রঘুবীরবাবু। ইনি অজিতেশবাবুর ডান হাত বলতে গেলে। সে বাগানের কাজকর্মের ব্যাপারেই হোক বা অন্য কিছু। এত বছর অজিতেশবাবুর সঙ্গে থেকে থেকে বাংলাটাও দিব্যি বলেন।

ঘরে বসে ছিলাম, দরজায় নক করে এসে ঢুকলেন। হাসিমুখে বললেন, “স্যারের শরীরটা ঠিক ভালো যাচ্ছে না, তাই তাড়াতাড়ি শুতে চলে গেলেন। কিন্তু আপনি চিন্তা করবেন না। যেক’দিন আছেন আমি আপনার সঙ্গে থাকব। সব ঘুরিয়ে দেখিয়ে দেব। কত লোক এসে থেকে গেছে আর আপনি তো স্যারের ভায়ের নেবার। কাল সকালে ব্রেকফাস্ট করে রেডি থাকবেন। ন’টা সাড়ে ন’টা নাগাদ আমি এসে আপনাকে নিয়ে বেরোব। গুড নাইট।”

ভদ্রলোকের সময়জ্ঞান ভালোই। ন’টার সময় এসে হাজির। আমিও তৈরী ছিলাম। ঘর থেকে বেরিয়ে দেখি বারান্দায় অজিতেশবাবু বসে আছেন আর কয়েকজন মহিলা স্থানীয় ভাষায় কিসব বলছে। অজিতেশবাবু আরো বেশী গম্ভীর, যেন একটু আড়ষ্টও, অন্যদিকে তাকিয়ে রয়েছেন। রঘুবীরবাবুকে আসতে দেখে ডাকলেন। কিছু কথা হল দুজনের মধ্যে। তারপর রঘুবীরবাবু মহিলাকূলকে কিছু বলতে তারা চলে গেল, প্রসন্নই মনে হল। অজিতেশবাবু সেরকমই উলটোদিকে তাকিয়ে রয়েছেন। এদের চলে যাওয়ার পর বোধহয় হুঁশ হল যে আমিও আছি ওখানে।

ঘাড় ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, “গুড মর্ণিং। যান ঘুরে আসুন রঘুবীরের সঙ্গে। ফিরলে একসঙ্গে লাঞ্চ করব।”

বেরিয়ে পড়লাম। যেতে যেতে জিজ্ঞেস না করে পারলাম না, “যারা এসেছিল তারা কি আপনাদের আপেলের বাগানে কাজ করে?”

রঘুবীরবাবু মাথা নাড়লেন, তারপর হেসে বললেন, “বাগানের শ্রমিকগুলো ভারি চালাক। দাবীদাওয়ার কিছু হলেই বউগুলোকে পাঠায়, নিজেরা আসে না।”

এতে চালাকির কি হল ঠিক বুঝতে পারলাম না, তাই বললাম, ‘কেন?’

“স্যার মেয়েদের সঙ্গে একদম কথা বলতে চান না। দেখছিলেন না কিরকম আড়ষ্ট হয়ে বসেছিলেন। তাড়াতাড়ি ওদের ভাগাতে পারলে বাঁচেন। এর আগে অনেক সময় ভালো করে সব কথা না শুনেই হ্যাঁ বলে দিয়েছেন এমনও হয়েছে। তারপর আমাকে সব সামলাতে হয়েছে। এমনিতেও আমিই সব সামলাই। তবে আমাদের এখানে খুব একটা শ্রমিক অসন্তোষ নেই।”

দেখতে দেখতে আপেলের বাগান এসে গেল। আপেল পাড়ার মরশুম এখন। অনিমেষবাবুর দৌলতে এই বাগানের আপেল খেয়েছি অনেক, এবার চাক্ষুষ দেখার সৌভাগ্য হল। রসে টইটুম্বুর অতি সুস্বাদু আপেল। কাছেই একটা লেক আছে, সেটাও দেখলাম। যেতে যেতে দেখলাম গ্রামের মধ্যে এক জায়গায় দুটো লম্বা লম্বা পাথর পোঁতা রয়েছে, তার ওপর ইতস্তত ফুল ছড়ান।

রঘুবীরবাবু জানালেন গ্রামেরই দুজনের স্মৃতিফলক। এর তরুণ আর এক তরুণীর। তারা প্রণয় ডোরে বাঁধা পড়েছিল। কিন্তু বিয়ে সম্ভব হয় নি। পরপার বলে যদি কিছু থাকে, সেখানে যাতে তারা একসাথে থাকতে পারে সেই কামনা করে এই স্মৃতিফলক।

হতাশ হলাম। শুধু এইটুকু? আর কিছু নেই? কেন তাদের বিয়ে হল না, অল্প বয়েসে তারা মারাই বা গেল কি করে?

রঘুবীরবাবু হেসে উঠলেন আমার কথা শুনে, হাসতে হাসতেই বললেন, “না না আর কোনো গল্প নেই। আগে আশেপাশে ভালো বন ছিল। চিতা বাঘটাঘও বেরোত। ছেলেটা বনে গিয়ে বাঘের কামড়েই মারা গেছিল। মেয়েটা তার কিছুদিন পরে। কি করে ঠিক জানি না, বোধহয় বিষটিষ খেয়েছিল।”

এই হাসিখুশী মিশুকে ভদ্রলোকটির সঙ্গে গল্প করতে করতে আবার ফিরেও এলাম। আমাকে নামিয়ে দিয়ে উনি চলে গেলেন।

“কেমন ঘুরলেন? কেমন লাগল আমার বাগান?” খেতে খেতে জিজ্ঞেস করলেন অজিতেশবাবু।

বললাম কেমন লাগল, কি দেখেছি সব।

অজিতেশবাবু দুঃখ করছিলেন এবার ওনার প্রিয় এই আপেল বাগান বিক্রি করে দিতে হবে। কেউ দেখার নেই। ওনার শরীরও ভালো যাচ্ছে না, ভাইরা এখান থেকে চলে আসতে বলছে।

“আমার তো যৌবন বার্ধক্য এখানেই কাটল, এই খোলামেলা পরিবেশে। জানি না এখন শেষ বয়েসে আপনাদের মতো শহুরে হতে পারব কি না। বাগান বিক্রি করে দিলেও আমার নিজের এখানে থেকে যাওয়ারই ইচ্ছে। ক’টা দিনই বা আর আছি? শহরের হইহুল্লড় আর গোলমাল ভালো লাগে না।”

ভদ্রলোককে আজ বেশ ভালো লাগছিল, কালকের মতো অত গম্ভীর ছিলেন না। হয়তো শরীর ভালো আছে বলেই। একথা সেকথার পর গ্রামের রাস্তার ধারের ওই স্মৃতিফলকদুটোর কথা বললাম। এসব ক্ষেত্রে সাধারণত যা হয় সেরকম একটা মন খারাপ করা গল্প শুনতে পেলাম না বলে যে কিঞ্চিত হতাশ হয়েছি তাও গোপন করলাম না।

ভদ্রলোক একটু যেন অন্যমনস্ক হলেন। খাওয়া প্রায় শেষের পথে, চাটনীর বাটিটা নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে বললেন, “ঠিকই বলেছেন। গল্প যে একেবারে নেই তা নয়, আছে। তবে তা জানে পুরোনো বাসিন্দারাই। আর সেও এর ওর কাছ থেকে শুনেই আর কিছুটা অনুমান করে। রঘুবীর নাও জানতে পারে। আর জানলেও এখন আর এসব নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না। কবেকার ঘটনা। পুরোনো কাসুন্দি ঘেঁটে আর কি হবে?”

শুনে কৌতূহল আরো বাড়ল। কিন্তু জানতে চাওয়া ঠিক হবে কিনা বুঝতে পারছিলাম না।

আমার মনের অবস্থা বুঝেই বোধহয় ভদ্রলোক আবার বললেন, “অনেকে এসেছে এখানে। ওই পাথরদুটোও দেখেছে। কিন্তু কেউ কিছু জিজ্ঞেস করে নি। এর পেছনে যে কোনো ঘটনা থাকতে পারে তাও কারুর মনে হয় নি। এক এই আপনারই হয়েছে। যতটুকু যা জানি আপনাকে বলব। খেয়ে নিয়ে আমার ঘরে আসুন।”

গেলাম। ইজিচেয়ারে আধশোয়া হয়ে ছিলেন অজিতেশবাবু। মুখোমুখি একটা চেয়ারে বসতে বসতে কুন্ঠিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “আমার কৌতূহল আপনার দুপুরের বিশ্রামে ব্যাঘাত ঘটাল না তো?”

অল্প হেসে বললেন, “না না গোটা দুপুর তো পড়েই রয়েছে। কতক্ষণ আর লাগবে বলতে?”

একটু থেমে দম নিয়ে আবার বলতে শুরু করলেন, “অনেক বছর আগেকার ঘটনা। তখন এদিকে ছোটো, বড়ো মাঝারি অনেক বাগান ছিল এদিকে। বাগানের মালিকেরা কেউ কেউ থাকতেন এখানে, কেউ যেতেন আসতেন। পরস্পরের মধ্যে সৌহার্দ্র ছিল। এমনই এক বাগানের মালিকের বাড়িতে বেড়াতে এল শহর থেকে তারই আত্মীয় একটি অল্প বয়সী ছেলে। অনেকদিন ছিল সে এখানে। মালিকের আত্মীয় হিসেবে নয় সবার সঙ্গে, বাগানে যারা কাজ করত তাদের সঙ্গেও সে বন্ধুর মতো মিশত। গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়াত। ফলে অল্পদিনের মধ্যেই গামের লোকেদের সঙ্গে তার সখ্যতা গড়ে উঠেছিল।

গ্রামেরই মেয়ে ছিল লছমী। উদ্ধত যৌবনের ছাপ তার সারা শরীরে, দু চোখের শরে হৃদয় ঘায়েল করার ক্ষমতা সে রাখত। গ্রামের ছেলেরা তাকে পাবার জন্যে পাগল কিন্তু নাগাল পায় না। সে কাউকে পাত্তাই দেয় না। কিন্ত তারও দুর্বলতা ছিল একজনের ওপরে। ছেলেটার নাম টিকু। বাপ মা মরা ছেলে, আপেলের বাগানে কাজ করে পেট চালায়। তাকে লছমীর কেন ভালো লাগত তা সেই জানে। বোধহয় টিকু তার সব হুকুম তামিল করত বলে। যত দুঃসাহসিক কাজই হোক না কেন লছমী বললে টিকু এক পায়ে খাড়া। মেয়ের মতিগতি বুঝে লছমীর বাপ একদিন গ্রামের মাতব্বরদের সামনে লছমীর সঙ্গে টিকুর বিয়ে পাকা করল। এরপর থেকে তো লছমী, টিকুর মেলামেশা আরো খোলাখুলিভাবে চলতে লাগল।

ওই ছেলেটির সঙ্গে এদের দুজনের ভালোই সম্পর্ক ছিল। লছমীর রাগ হলে টিকুকে মানভঞ্জনের উপায় এই বাতলাত। লছমী, টিকু দজনেই একে পূর্ণ বিশ্বাস করত।

এক সকালে ছেলেটি তাদের বাগান থেকে একটু দূরে একটা নিরিবিলি জায়গায় বসে ছিল, লছমী এল তার কাছে। মুখ গম্ভীর। জিজ্ঞেস করে জানা গেল সমস্যা জটিল। লছমী যা বলে টিকু সব করে দেয়, আজ পর্যন্ত কখনো না বলে নি। কাল টিকু লছমীকে দুপুরে রান্না করে খাওয়াতে বলেছিল। রান্না তো করে এনেছিল লছমী কিন্তু রান্নাটা নাকি তেমন ভালো হয় নি। টিকু মুখে কিছু বলে নি কিন্তু তার যে পছন্দ হয় নি সেটা লছমী ভালোই বুঝেছে। এতে তো লছমীরই হার হল।

সব শুনে ছেলেটি বলল, ‘তা বেশ তো এবার তুমি এমন একটা কিছুর বায়না করো টিকুর কাছে যা ও পারবে না। তাহলেই তো হল।’

লছমীর মুখ প্রসন্ন হল, কিন্তু কিসের আবদার করবে? অনেক মাথা খাটিয়ে ছেলেটি বুদ্ধি বার করল। লছমী শুনে খুশী মনে চলে গেল, বলে গেল কাল ও এখানেই এসে দেখা করবে, জানাবে কি হল।

পরেরদিন যথাসময়ে লছমী দৌড়তে দৌড়তে এল। খুব খুশী। টিকু রাজি হয়েছে বটে কিন্তু পারবে না, ও জানে। এত সোজা নাকি? খুশীতে ডগমগ হয়ে লছমী এসব কথাই বলছিল আর ছেলেটি মুগ্ধ চোখে ওকে দেখছিল। ছেলেটি ভেবেই এসেছিল যে আজ ও লছমীকে বুঝিয়েই ছাড়বে যে টিকু ওর যোগ্য নয়। টিকুর চেয়ে ও হাজার গুণ সুখী করবে ওকে। কোথায় ও আর কোথায় টিকু! কিন্তু সব বলা হল না। ছেলেটির দৃষ্টিতে, ভাবভঙ্গিতে এমন কিছু ছিল যে লছমী ছিটকে সরে গেল। এক মুহূর্ত দেখল ওকে, তারপরই দৌড় লাগাল গ্রামের দিকে। কিন্তু মর্মান্তিক আঘাত অপেক্ষা করেছিল ওর জন্যে, পথেই পেল সে দুঃসংবাদ। টিকু বাঘের আক্রমণে মারা গেছে। কাজকর্ম ছেড়ে কি করতে সে বনে গেছিল তা কেউ জানে না। লছমী একটা কথাও বলল না, এক ফোঁটা চোখের জলও ফেলল না। কিন্তু পরেরদিন দেখা গেল সে সম্পূর্ণ উন্মাদিনী। চুপচাপ বসে থাকে, তার তীক্ষ্ণ চোখ সর্বদা যেন কাকে খোঁজে। মাঝে মাঝে জ্বলন্ত চোখে তাকায়, আবার কখনো উচ্চৈঃস্বরে হেসে ওঠে কিন্তু কাউকে কিছু বলে না। মাস কয়েক পরে তারও এই ভারসাম্যহীন জীবনের অবসান ঘটল। বোধহয় কিছু খেয়েছিল। গ্রামের লোক তাদের আত্মার শান্তির জন্যে পুজোআচ্চা করে দুটো পাথর পুঁতে দিল।

এই হল গল্প। আশা করি আপনার কৌতূহল মিটেছে,” অজিতেশবাবু থামলেন।

ভদ্রলোককে বেশ ক্লান্ত দেখাচ্ছিল, তাই আর মুখ ফুটে বলতে পারলাম না যে আমার জিজ্ঞাসা এখনো শান্ত হয় নি। বন্ধুত্বের মুখোশের আড়ালে ওই ছেলেটি কি বুদ্ধি দিয়েছিল লছমীকে জানা হল না, জানা হল না সেই বা কি করল এরপর।

উঠে এলাম। সারাটা দিন মাথার মধ্যে লছমীর কথাই ঘুরতে লাগল। সহজ সরল দুজন গ্রাম্য যুবক যুবতী বিশ্বাসের কি মূল্যই না চোকাল! পরের দিনও এদিক ওদিক ঘুরে কেটে গেল। তার পরেরদিন সকালেই ট্রেন। ফিরে যাওয়ার জন্যে তৈরী হয়ে অজিতেশবাবুর কাছে বিদায় নিতে গিয়ে শুনলাম উনি নেই। হঠাৎ কি জরুরি দরকারে বেরিয়েছেন, ফিরতে দেরী হতে পারে। রঘুবীরবাবু গাড়ি নিয়ে তৈরী আমাকে স্টেশনে ড্রপ করার জন্যে। মনটা খারাপ হল। যাওয়ার সময়েই ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা হল না। আমাকে দুদিন এত যত্ন আদর করলেন। কাল রাতেও কত কথা হল, জানলে তখনই ওনাকে এই আতিথেয়তার জন্যে ধন্যবাদ জানিয়ে রাখতাম।

রঘুবীরবাবু একটা খাম আমার হাতে দিয়ে বললেন, “স্যার থাকতে পারলেন না আপনার যাওয়ার সময়ে তাই দুঃখপ্রকাশ করেছেন। এই চিঠিটা আপনাকে দিয়ে গেছেন।”

স্টেশন এসে গেল, এক সময়ে ট্রেনও ছেড়ে দিল। প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা রঘুবীরবাবুর হাসি মুখটাও আস্তে আস্তে ছোটো ছোটো হতে হতে মিলিয়ে গেল।

খামটা খুললাম। অজিতেশবাবুর হাতে লেখা চিঠি।

সুহৃদবরেষু,

আমার ভায়ের কাছ থেকে আপনার সম্পর্কে অনেক কথা শুনেছি। আলাপ করার সুযোগ হল এই প্রথম। দেখে বোঝা যায় আপনি আলাদা, আপনার দেখার চোখ আছে। কিছু না বললেও যে কিছু আছে তা বোঝার ক্ষমতা আপনার আছে। তাই আপনাকে সব বলেছিলাম। যা কখনো কোনোদিন কাউকে বলিনি। কিন্তু বলে দুদিন ধরে এক অস্বস্তি বয়ে বেড়ালাম। বললামই যখন তখন সব সত্যি বললাম না কেন? এই বুড়ো বয়সে আর কিসের সংকোচ। বরং সত্য স্বীকারে যদি কিছুটা পাপ স্খালন হয়।

হ্যাঁ ওই ছেলেটা আর কেউ নয়, স্বয়ং আমি। কলকাতা থেকে এসেছিলাম এখানে। লছমীর গ্রাম্য সরলতা ভরা সৌন্দর্য, উপছোনো যৌবন আমাকে মোহগ্রস্ত করেছিল। হিতাহিত জ্ঞান অবধি বিসর্জন দিয়েছিলাম। টিকুকে আমার প্রতিদ্বন্দী ভাবতে শুরু করেছিলাম।

তখন এদিকে ভালোই বনজঙ্গল ছিল। গ্রামের লোকের মুখেই শুনেছিলাম যে বনে নতুন করে চিতার উপদ্রব শুরু হয়েছে। দু তিনটে ছোটো ছোটো বাচ্ছাও দেখা গেছে। আমিই লছমীকে বুদ্ধি দিয়েছিলাম টিকুকে বাঘের বাচ্ছা ধরে আনতে বলার। নিজের প্রণয়িনীর সামনে বীরত্ব জাহির করার ইচ্ছে টিকুর এতই প্রবল ছিল যে নিজের ভালোমন্দের বোধও থাকত না। আমি ওর এই দুর্বলতা জানতাম বলেই এই ফাঁদ পেতেছিলাম। লছমীও সরল বিশ্বাসে টিকুর কাছে বাঘের বাচ্ছার বায়না করল। এই দুঃসাহসিক কাজের পরিণাম কি হতে পারে তা টিকুর অজানা ছিল না কিন্তু তাও গেল। ফল কি হয়েছিল তাতো শুনেছেন। লছমী পাগল হয়ে গেছিল ঠিকই কিন্তু টিকুকে বনে পাঠানোর পেছনে আমার আসল উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে গেছিল।

কৃতকর্মের প্রায়শ্চিত্ত সহজ নয়, সহজ নয় পাপ মোচনও কিন্তু যে যন্ত্রণা আমি এত বছর বয়ে চলেছি তাও অবর্ণনীয়। অনেকবার ভেবেছি চলে যাব এখান থেকে কিন্তু পারিনি, কি কারণে নিজেও জানি না।এখানকার অল্প বয়সী মেয়েদের দেখলে  এখনও আমার লছমীর কথা মনে হয়। এখনও চোখ বন্ধ করলে লছমী এসে দাঁড়ায় আমার সামনে দু চোখ ভরা আগুন নিয়ে, আঙুল তোলে আমার দিকে, তারপর আবার হাহা করে হেসে ওঠে।

আর পারছিলাম না। তাই এই ভার লাঘব করার উদ্দেশ্যে আপনাকে সব বললাম। কনফেশন বলতে পারেন। জানি কি ভাবছেন আপনি, ভাবছেন দু তিনটে দিন একটা খুনীর সঙ্গে কাটিয়ে গেলেন এক বাড়িতে, এই তো? ভাবলেও ভুল ভাবছেন না। পরোক্ষভাবে খুনই করেছিলাম আমি টিকুকে, নষ্ট করেছি দুটো জীবন।

এই চিঠি আপনি যত্ন করে রেখে দেবেন না ছিঁড়ে ফেলবেন সেও আমি আপনার ওপরেই ছেড়ে দিলাম।

আপনার যাত্রা নিরাপদ হোক। ভালো থাকবেন।

অজিতেশ রায়।

চোখের সামনে আরেকবার ভেসে উঠল দুটো পাথরের ফলক আর অজিতেশবাবুর মুখটা।

Latest posts by অদিতি ভট্টাচার্য্য (see all)