শৈশবে জন্মভূমি পূর্ব পাকিস্তান ছাড়া এই পৃথিবীতে আর দুটো মাত্র জায়গা আছে বলে আমার  জানা ছিল । একটার নাম কলিকাতা আর অপরটার নাম হিন্দুস্থান । আমার বয়সের শিশুরা সেইসময় এই দুটো নাম বড়দের মুখে বেশ শুনতো । শৈশবের এই জানা আর না জানার ,খুব কম দৈর্ঘ্যের এই জীবনটা পরবর্তীতে আমরা বেশ সহজেই হারিয়ে ফেলি । আর এরকম অনেক জানা না জানাকে বাতিল করে করে আমরা বড় হয়ে উঠতে থাকি । মাথা ঘামাতে থাকি জানা অজানার মধ্যে অনেক সত্য ও অসত্য নিয়ে ।

তখন কি খুব বেশি বড় হয়েছি ? ১৯৬৯ সাল । শিলিগুড়িতে সদ্য স্কুল ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে ঝাড়া হাত পা হয়েছি । চলছে বড় হওয়ার নানা কায়দা কসরৎ  । ঠিক এই সময়ই এক সন্ধ্যা রাতে দার্জিলিং মেল থেকে শিয়ালদা স্টেশনে এসে নামলাম । কলিকাতা তথা কলকাতার সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎ । আবহে তখন বাজছে চলমান ট্রামের অদ্ভুত ঘন্টার আওয়াজ । স্টেশনের বাইরে বেরিয়ে টের পেলাম বুকের খাঁচায় লুকিয়ে থাকা শৈশব পালাই পালাই করছে । ধাবমান এত মানুষ! সবাই যেন কী কারণে ঊর্ধশ্বাস । একটানা প্রায় চব্বিশ ঘন্টা রেল ভ্রমণের পর অপ্রত্যাশিত এই পরিবেশে কিছুটা দিশেহারা । সঙ্গের ছায়াসঙ্গী বন্ধুটি হাত ধরে টেনে নিয়ে এক রেস্তোঁরায় ঢুকিয়ে বলল “কী রে ঘাবড়ে গেছিস নাকি।” সে বেশ পোক্ত । বলল “চল কিছু খেয়ে নিই—তারপর তোর দাদার বাড়ির ঠিকানা খুঁজতে বের হবে ।” আমাকে সেই ঠিকানায় জমা করে বন্ধু চলে যাবে বরানগর । মনে মনে ভাবছি এই রাতে এও কি সম্ভব । ভয়ার্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলাম ” হ্যারে তুই পারবিতো?”

ঠিকানা খোঁজার সেই বুঝি  শুরু । তারপর বোধ হয় নাগাড়ে প্রায় বছর তিরিশ ধরে চলে এই শহরে যাওয়া আসা আর ঠিকানা খোঁজা । বর্হিবঙ্গ থেকে এই শহরে যাতায়াতের বাধ্যবাধকতা থেকে আমিও মুক্তি পাইনি । নাকি মুক্তি চাইনি ! আসলে সময়ের টানে এসব ভাবার হয়তো সময় ছিলনা । যাহোক, তারও কিছুটা পরে অনেক বয়স সময় খেয়ে খেয়ে আমি নিজেই একটি ঠিকানার মধ্যে ঢুকে পড়েছি এই শহরে । তাড়া খাওয়া অবুঝ শৈশব তারপর কি সত্যিই হারিয়ে গেল ? না বোধ হয় । এখনও শিয়ালদা গেলে তার সাথে দেখা হয় । একই রকম চঞ্চল, কৌতুহলী চোখ । তবে তার বয়সটা এর মধ্যে কিছুটা বেড়ে গেছে, এই যা । হাঁটার গতি একটু কম । রাস্তা হারানোর ভয়টা অনেক কম । কর্মজীবন বলে এখন আর কিছু নেই । সবটাই মর্মজীবন । এখন আর কথায় কথায়  কলকাতার এমাথা ওমাথা করা  হয়না । খুব বেশি হলে কলেজ স্ট্রীট । তবে বড় বড় বিজ্ঞাপনের বিল বোর্ড দেখে এখনো সে আগের মতই  ভয় পায় । তার ছোট বেলায় কলকাতা শহর জুড়ে বিশাল অজগর মার্কা  উড়ালপুলগুলো ছিলনা । এই গুলোও কিছুটা ভয়ের বইকি ।

উঠতি বয়সে জানতাম পশ্চিমবঙ্গে একটাই শহর । নাম কলকাতা । বাদবাকিগুলো সব মফঃস্বল শহর । শহর কথাটির সঙ্গে মফঃস্বল যুক্ত হলে যে বিস্বাদ ঠেকতো তা ওই বয়সে বেশ বুঝতে শুরু করেছিলাম । পশ্চিমবঙ্গ আসলে একটি ওয়ান সিটি স্টেট । ভারতের অন্যান্য রাজ্যগুলো ঠিক এমন নয় । অবশ্য কলকাতা অনেক দিন থেকেই একটা ব্র্যান্ড হয়ে গেছে । এই ব্র্যান্ডের কদর সারা ভারতেই । এই ব্র্যান্ডের মায়ার বাঁধনে মানুষ অকাতরে আটকে যায় এখানে । তবু  যদি নিজেকে কেউ ছিন্ন করতে চায় তবে তা যে খুব সহজ কাজ নয়- তা বলা বাহুল্য । জানা যায় যে তিনটি গ্রাম নিয়ে আদি কলকাতার পত্তন হয়েছিল । তো সেই সব গ্রামবাসীদের কোন বংশসূত্র কি এখনো বর্তমান ? কেউ কি তেমন দাবী করেন ? আমি অন্তত শুনিনি।  মনে হয় ইংরেজ পত্তনিদারদের দাপটে  কলকাতার ভূমিপুত্ররা সুচনালগ্নেই হারিয়ে গেছে । বরং ক্রমাগত বাইরে থেকে আমদানী হয়েছে কাজের লোকের । কেজো শহর কলকাতা গড়ে ওঠেছে তাদের শ্রমে ঘামে ।

তাই কলকাতা শুরুর থেকেই খুব একটা বাঙালি নয় । অথচ ঘটনাচক্রে এটা এখন এক বাংলার রাজধানী । বাঙালি জাতি-সত্তা এখানে বেশ অবান্তর। কলকাতা বৃত্তের কেন্দ্রে বাঙালি এখন খুঁজে বের করতে হয় । শ্রমজীবী কলমজীবী লক্ষ্য লক্ষ্য বাঙালি প্রতিদিন কলকাতায় আসে । তারা সকালে আসে রাতে ফিরে যায় । কলকাতা-বৃত্ত পরিধির বাইরে যারা থাকে তারা বেশির ভাগ উদ্বাস্তু । পূর্ববঙ্গীয় এই উদ্বাস্তুদের আগমন না ঘটলে এখানে কী হতো বলা মুস্কিল । একদা বিধান রায় কল্পিত  বিহারের সঙ্গে মার্জারের বিষয়টা হয়তো বাস্তব রূপ পেয়ে যেত । ব্রিটিশ উপনিবেশের খাঁটি সন্তান কলকাতা । উপনিবেশ বিরোধিতার সূত্র ধরে কলকাতায় যতটা ভারতীয়ত্বের চাষ হয়েছে তার দশ শতাংশও বাঙালি জাতি-সত্তা কথা হয়নি । পরবর্তীতে ভাষাভিত্তিক রাজ্য গঠনও এই রাজধানীকে ভাষা-জাতির কোন ধারণা দেয়নি । নিখাদ কসমোপলিশ ।

অপরিসর গলি, গায়ে গায়ে লাগানো বাড়ি , সাইনবোর্ডে “গৃহস্থ বাড়ি”লেখা দেখে বুঝে নিতে হয় এটা অন্য পাড়া । যেন হে খদ্দের ভুল করোনা । কোন নৈতিক সংঘাত নেই যেন । বিবিধ বৈপরীত্যের অপূর্ব সহাবস্থান । আবার তার বিপরীতও যে নেই তা নয় । তবু কলকাতা একদিন কল্লোলিনী তিলোত্তমা হবে এমন কবিতার লাইন জীবনানন্দ লিখেছিলেন কেন তা আজো বেশ প্রহেলিকা মনে হয় । কলকাতার জন-অরণ্য একটু খুঁটিয়ে দেখলে দেখা যায় কলকাতা আসলে অনেকগুলো কলকাতার এক সমষ্টি । সচরাচর তাদের মধ্যে অপরিচয়ের ব্যবধানটাই বেশি । যুগ যুগ ধরে তারা পরস্পর অপরিচিত থাকতেই যেন ভালবাসে । আত্মস্বার্থপরায়নতা মজ্জাগত ।

কিছুদিন আগে এক ভদ্রলোক মারা গেলেন প্রায় নব্বই বছর বয়সে । তিনি আটচল্লিশ সনে কলকাতা শহরে এসেছিলেন দেশভাগের সুবাদে । আমার সঙ্গে তাঁর যখন দেখা হয় তখন তিনি মধ্যবয়সী চাকুরিজীবী প্রতিষ্ঠিত একজন সংসারী । আশ্চর্য যে মারা যাওয়ার আগে পর্যন্ত তিনি একবারের জন্য শুধু কলকাতার বাইরে গিয়েছিলেন । সেটা চাকরির সুবাদে আসানসোলে বদলি হয়ে গিয়েছিলেন বছরখানেকের জন্য । এই শহরের বাইরের কোনকিছুর ব্যাপারে তাঁর আগ্রহ ছিল না । এই কোনকিছুর মধ্যে মানুষও ছিল আমার বিশ্বাস । কারণ কখনো তিনি যেমন আত্মীয় বাড়ি যেতেন না, তেমনি কোন আত্মীয় তার বাড়িতে আসুক সেটাও খুব কাঙ্খিত ছিল বলে মনে হয় না । আমার সঙ্গে তার যে ক’বার দেখা হয়েছিল কোনবারেই তিনি ” আবার আসিস” কথাটা বলেননি । অথচ তা বলার কথাইত ছিল । কারণ তিনি ছিলেন আমার আপন মামা ।