জীবনের ছোট্ট পরিসরে যেটুকু সামান্য শিক্ষা পেয়েছি, তার মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা অবশ্যই ভয় পাওয়া। ভেতো বাঙালির ভীতুপনায় যতটা না অনুপ্রাস অলঙ্কারের ছোঁয়া, তার চেয়েও বেশি বোধহয় স্বস্তির আশ্বাস। ভয় না পেলে অ্যাড্রিনালিনের হিসাব-নিকাশ মেটাতে হয়ত ভয়ঙ্কর কিছু করে বসাটা অস্বাভাবিক ছিল না। ভেবেও সুখ হয় যে আমি ভয় পাই। তবে আজ শুধু কিছু শ্রেণীর মানুষের কথাই বলতে চাই যাদের থেকে ভীতি বড়ই অস্বস্তিকর ও অসুখকর।

এই তালিকায় সবার উপরে স্থান দিতে চাই জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে যে কোনো ধরনের বিমাকর্মীকে। জন্মলগ্নে মুখে দেওয়া মধু ভেজাল না হলে কেউ বোধহয় বিমা বেচতে পারে না। এদের ঠোঁটের গোড়ায় মৃত্যু, অঙ্গহানি, প্রাকৃতিক বিপর্যয় জাতীয় যে হাজারো অশুভ ভবিতব্যের ক্যাটালগ ঝোলে, তা পড়লে ভগবানও ভয় পেতে বাধ্য। এরা কোনো এক সহজাত প্রতিভার বশে এক সুন্দর ঝকঝকে সকালে আপনার মুখে ফুটিয়ে তুলতে পারে বিরক্তির টান। এদের প্রকাশ্য উপস্থিতি কোনো অপরাধ ছাড়াই আপনার মধ্যে জাগিয়ে তুলতে পারে মুখ লুকিয়ে পালিয়ে যাওয়ার এক অদম্য ইচ্ছে। আশ্চর্যের বিষয় এই যে, আপনার সবচেয়ে পরিচিত বিমাকর্মীই কিন্তু আপনাকে সবচেয়ে বেশী বিব্রত করে থাকবে। এর পর হঠাৎ একদিন আপনি যদি উপরোক্ত ঝুঁকিগুলোর চেয়েও বেশী ঝুঁকি নিয়ে একটি পলিসি কিনে ফেলেন এবং আশা করেন যে আপনার অতি শুভাকাঙ্খী সেই বিমাকর্মী কৃতজ্ঞতা না হলেও সহায়তার দিকটি দেখবেন, তবে ভুল বড় ভুল – সে ডুমুরের ফুল, আর আপনি এপ্রিল ফুল। কিছুকাল পরে হঠাৎ তার দেখা পাবেন আরও কিছু নতুন বিপর্যয়ের সম্ভাবনা নিয়ে। এদের সাথে সাক্ষাতের পর আমি অবশ্যই বলব যে তোমাদের সবচেয়ে বেশী ভয় পাই।

পরের যে শ্রেণীকে খুবই ভয় পাই, তারা হল ‘নতুন বাবা’। প্রথম সন্তানের জন্মকে কেন্দ্র করে যে সমস্ত পুরুষ তাদের পরিচিতির বৃত্তে এক অস্থিরতা সৃষ্টি করতে সমর্থ হন, তারাই এই ‘নতুন বাবা’। এদের ভয় প্রদর্শন অবশ্য কিছুটা ইচ্ছাকৃত, কিছুটা অনিচ্ছাকৃত। সন্তানলাভের আভাস পাওয়া থেকে এদের মধ্যে যে এক দুর্বোধ্য ত্রাসের সঞ্চার হয়, তারা সেটা অতি সফলভাবে তাদের সামাজিক পরিমন্ডলে বিকিরণ করতে সমর্থ হন। আগামী প্রজন্মের আবির্ভাবে হঠাৎ করে এদের দর্শনশাস্ত্রে পান্ডিত্যের এক মহান উপলব্ধি ঘটে, এবং তাদের সেই দার্শনিক দংশনের প্রতিষেধক আজও উদ্ধার হয়নি। সন্তানকে ঢাল করে কিছুকাল ধরে তাদের কর্মবিমুখতা, সময়ানুবর্তিতার অভাব ও কার্পণ্যের পাঁচমিশালী প্রযোজনা বেশ ভয়ঙ্কর। এর সাথে বোনাস হিসাবে অবশ্যই থাকে তাদের সন্তানের ক্রিয়াকর্মাদির বিষদ বিবরণ, যা কখন মুগ্ধতা থেকে বিরক্তি হয়ে ভীতির সাম্রাজ্যে প্রবেশ করে, তারা নিজেও বোঝেন না।

পরের যে শ্রেণীর উল্লেখ করব, তারা অবশ্য এক দশক আগেও তেমন ভয়ঙ্কর ছিলেন না। কিন্তু সোসাল নেটওয়ার্কিং যুগে এরা বেশ ভয়ঙ্কর। এরা নিজেদের পরিচয় দেন সখের ফটোগ্রাফার হিসাবে। গলায় এস্‌এল্‌আর ক্যামেরা ঝুলিয়ে যত্রতত্র ছবি তুলে বেড়ানো নিশ্চয়ই সমাজের পক্ষে হিতকর, অন্যথায় তাদের অলস সময় কারুর দুর্দশায় পর্যবসিত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল প্রবল। কিন্তু তাদের ক্যামেরাবন্দী ছবির প্রশংসাপ্রাপ্তির প্রচেষ্টা বাকিদের কাছে খুবই ভীতিকর। ম্যাক্রো থেকে বক্র কলার যে অধিকাংশ ছাইপাশ চারপাশে বয়ে বেড়াচ্ছে, তাদের প্রশংসা না করাটা যেন আপনারই অজ্ঞতার পরিচায়ক। আর যদি কখনও নিজের অজান্তে তাদের এই মহান শিল্পের খুঁত নিয়ে চর্চা করে ফেলেন, তাহলে তা অবশ্যই রাজদ্রোহের সমান।

এছাড়াও আরও অনেক শ্রেণীর মহানুভব হয়েছেন যারা আমার ভীতি আদায়ে খুবই সফল হয়েছেন। তাদের চর্চা না হয় অন্য আরেকদিন হবে। কিন্তু এদের সবার প্রতি রইল আমার কৃতজ্ঞতা – ভয়ে আছি, ভাল আছি।

Latest posts by অনির্বাণ রায় (see all)