[বেশি মাথা ঘামাবার দরকার নেই – এই গল্পটার অণুপ্রেরণা অঞ্জন দত্ত-নিমা রহমানের ‘প্রিয় বন্ধু’। সেই গল্পটাকেই ঠিক আজকের তারিখে দাঁড়িয়ে দেখলাম। হ্যাঁ পরিপ্রেক্ষিতটা অনেকটা পালটে দিয়েছি। আর শুভ্রদীপ মুখার্জীকে ‘ঠিক থাকিস’ শর্ট ফিল্মটা বানিয়ে ‘প্রিয় বন্ধু’র কথা মনে করাবার জন্য অনেক ধন্যবাদ]

(১)

শাল্মলী,

বিশ্বাস করবি কিনা জানিনা – হয়তো তোর মতো লিটারেচারের ছাত্রীর পক্ষে বিশ্বাস করা কঠিনই হবে – কিন্তু সহজ পাঠের পর আমার রবীন্দ্রনাথ প্রথম পড়া নয় – শোনা। বাবার দু’টো ক্যাসেট ছিলো – প্রদীপ ঘোষের আবৃত্তি, একই সিরিজের ক্যাসেট-একটার কভার ছিলো নীল, একটার কমলা।

আসলে তুই বই পড়িস কি না পড়িস-কবিতায় আগ্রহ থাকুক কি না থাকুক-গান শুনিস কি না শুনিস। রবি ঠাকুরকে সম্পূর্ণভাবে অ্যাভয়েড করে বাঙালী হিসেবে বড়ো হওয়া খুব মুশকিল।কোনো না কোনো দিক দিয়ে রবি ঠাকুর ঠিক ঢুকে পড়বেন।

রবি ঠাকুর তোর কাছে কি জানিনা – আমার কাছে হয়তো – আমার বড়ো হয়ে ওঠা।

~তৃষিত

(২)

তৃষিত,

হায়দ্রাবাদ গিয়ে গাছ আঁতেল হয়ে গেছিস – রবীন্দ্রনাথ বড়ো হয়ে ওঠা – বাব্বা। আর লিটারেচারের স্টুডেন্ট বলে সবসময় মোটেই রবীন্দ্রনাথ মুখে করে বসে থাকতে হয়না।  জানিস এখানে কালবৈশাখী হলো কাল। বছরের প্রথম।একশো আঠেরো কিলোমিটার। প্রায় আয়লা ছুঁই ছুঁই করছিলো।  তোর আয়লার দিনটা মনে আছে?

~শাল্মলী

(৩)

 

শাল্মলী,

মনে থাকবেনা? ঝড়ের খবর আসতে সাথে সাথে অফিস বিল্ডিংটা খালি করে দেওয়া হলো।তোর বাড়িটা ভাগ্যিস অফিসের কাছাকাছি ছিলো। সেদিনকে সবাই মিলে তোর বাড়ি গিয়ে সারারাত জমাটি আড্ডা-ডাম্বশ্যারাড।

বাকিরা কেমন আছে রে? নীহার তো এখন স্টেটসে।

এখানে অনেকদিন বৃষ্টি হয়নি। হায়দ্রাবাদে মোটামুটি তিনটে ওয়েদার – গরম,আরো গরম, আরো আরো গরম।

~তৃষিত

 

(৪)

তৃষিত,

সরি রে – মেল করতে সপ্তাহখানেক দেরী হয়ে গেল। ইন্টারেনেটের ইউসেজ লিমিট এক্সিড করে যাচ্ছিল। তাই কদিন আর বসা হয়নি।

নেটে দেখলাম তোদের ওখানে এখন বিয়াল্লিশ চলছে। বেঁচে আছিস কি করে?

জানিস সেদিন একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটলো – অফিস থেকে বেরিয়ে গাড়িটা ক্যামাক স্ট্রীটে ঢুকিয়েছি।সন্ধে নামবো নামবো করছে। সিগনালে গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। একটা বাচ্চা ছেলে বছর ছয়েক বয়েস হবে-একগোছা গোলাপ ফুল বিক্রি করতে চলে এলো গাড়ির পাশে। নেবো না নেবো না করে একটা নিলাম।কিন্তু সে দেখি আমায় পুরো তোড়াটা দিয়ে দিচ্ছে, আমি বললাম অতো ফুল নেবোনা-সে টাকা দিতে হবেনা বলে পুরোটাই দিয়ে চলে গেল।

ফুলগুলো আমার খাটের পাশে বেডসাইড টেবিলটায় রাখা আছে। একটু শুকিয়ে গেছে।

~শাল্মলী

 

(৫)

শাল্মলী,

 

কোলকাতা শহরটাই একটা আধপাগলা বাচ্চা ছেলে – নয়?

জানি তুই আঁতেল বলবি-কিন্তু দেখ এই যে একটা শহর – দেশের অন্য অনেক বড়ো বড়ো শহরের তুলনায় অনেকটা আন্ডারডেভেলপড – অনেক সমস্যা – অনেক রুক্ষতা নিয়ে যে সামগ্রিক একটা বেঁচে থাকা তুলে ধরে-সেটা ভারতের অন্য শহরগুলোয় আমি পাইনি।

মুম্বই কিন্তু আমার খুব ভালো লেগেছিলো – শহরটার একটা চরিত্র আছে। হায়দ্রাবাদটা আবার অন্যরকম। পুরোনো হায়দ্রাবাদ আর এই মাধাপুর, হাইটেক সিটি এরিয়াগুলোকে মেলালে বোঝা যায়না এই দুটো আসলে একই শহরের এদিক ওদিক। যেনো একটা প্রাচীন রিপ ভ্যান উইঙ্কল হঠাত করে ঘুম ভেঙে দেখছে পৃথিবীটা পালটে গেছে, হায়দ্রাবাদে চক্কর মারলে এরমই একটা ফিলিং হয়।

পুজোয় আসছি-দেখা হবে।

~তৃষিত

 

(৬)

তৃষিত,

দেখা হবেনা। আমি কাজিরাঙা যাচ্ছি ওইসময়। একটা ফরাসী পার্টিকে নিয়ে।

পুজোয় ভালো করে ছবি তুলিস। আমি তো মিস করবো – তোর ছবিগুলোই দেখবো।

~শাল্মলী

(৭)

শাল্মলী,

 

আজই কোলকাতা থেকে ফিরলাম। কয়েকটা ছবি অ্যাটাচ করে পাঠালাম। দেখিস।

কোলকাতা কেমন আছে রে? এবারে কোলকাতায় গিয়ে কি’রম একটা চাপা অস্থিরতা দেখলাম গোটা শহরটার মধ্যে। সবকিছু বড্ডো বেশী অসহিষ্ণু।

~তৃষিত

 

(৮)

তৃষিত,

চাকরিটা ছেড়ে দিলাম। আর ভাল্লাগছেনা। একটা বই লেখার প্ল্যান ঘুরঘুর করছে অনেকদিন ধরে। দেখি। এমনিই মা বলছে বছর দুয়েকের মধ্যে বিয়ে দিয়ে দেবে –ভাবলেই গা টা যেন কেমন করে।

শুধু কোলকাতা কেন – তোর সো কল্ড অসহিষ্ণুতা কি হায়দ্রাবাদেও নেই। কিছুদিন আগে অবধি তো বেশ পলিটিকাল আনরেস্ট ছিলো।

~শাল্মলী

 

(৯)

শাল্মলী,

কোলকাতায় একটা চাকরির চেষ্টা করছি। আর ভালো লাগছেনা। আসলে এই শহরটা যদ্দিন খুব অন্যরকম ছিলো – তদ্দিন ঠিক ছিলো –কিন্তু এখন কি হচ্ছে জানিস তো – সকালে অফিসের বাসে চড়ে অফিস করতে যাচ্ছি – চারপাশে বড়ো বড়ো স্কাইরাইজার – সুন্দর সুন্দর আর্কিটেকচার । কিন্তু হঠাত করে কোথাও একটা ফাঁকা জমি বেরিয়ে পড়ছে। আর তার মাথা জুড়ে একটা পুজো পুজো আকাশ।

~তৃষিত

(১০)

তৃষিত,

দিল্লীতে মেয়েটার সাথে যা হলো – কিছু বলবি না?

~শাল্মলী

(১১)

শাল্মলী,

দেশ শব্দটার মানে এক একজনের কাছে একেক রকম।আমার আজকাল কেন  জানিনা মনে হয় আমরা প্রত্যেকে নিজের নিজের মতো করে একটা দেশ বানিয়ে নি। যে দেশটা আমার তোর কাছে কম্ফর্টেবল সেটাই আমাদের দেশ – আমাদের ভারত। আমার তোর দেশ যেরকম এই লম্বা নেভার এন্ডিং ইমেল চেনটা।

দিল্লীতে যেটা হলো – তারপর তোকে এই চিঠিটা লিখতে ভয় করছে। মেয়েটার সাথে যে অমানুষগুলো কাজটা করলো – আমি তার সাথে সেম জেন্ডার শেয়ার করি এই লজ্জা লুকোই কোথায়।

এইসব ঘটনাগুলো আমাদের ছোটো ছোটো দেশগুলোকে মাঝে মাঝে কড়া নেড়ে বলে দিয়ে যায় – যে বাইরে একটা বৃহত্তর ভৌগলিক ভারত আছে-যেটা এতোটা কম্ফর্টেবল নয়।

আর আশ্চর্যের ঘটনা দেখ-মেয়েটা ‘লাইফ অফ পাই’ দেখে ফিরছিল-যেটা চূড়ান্তভাবে জীবনের ছবি।

~তৃষিত

 

(১২)

তৃষিত,

আজকাল কিছুই বুঝে উঠতে পারিনা – তুই পারিস?

কোলকাতা, দিল্লী, ইরাক, অ্যামেরিকা, ইজরায়েল, প্যালেস্টাইন আমার কিরম সব গুলিয়ে যাচ্ছে।

কোলকাতায় এখন প্রথম বসন্ত। কি করে বুঝলাম জানিস? সেদিন বাড়িস সামনের গাছটায় একটা কোকিল দেখলাম। ছবি তুলেছি মোবাইলে। পাঠালাম – দেখিস।

~শাল্মলী

 

(১৩)

শাল্মলী,

কোলকাতায় একটা চাকরি পেয়েছি রে। মাস তিনেকের মধ্যে  ফিরছি।

~তৃষিত

(১৪)

তৃষিত,

হাসি, ডিগবাজি, হাততালি – যতরকম স্মাইলি হয়।

দারুণ খবর। দারুণ, দারুণ, দারুণ খবর। চলে আয়। ওয়েট করা শুরু করলাম।

এবার ফিরে একটা বিয়ে কর।

(“আমার মতো ধিঙ্গি না – মিষ্টি সংসারী টাইপ”)

~জয়িতা থুড়ি শাল্মলী

(১৫)

শাল্মলী,

অল মাই ব্যাগস আর প্যাকড অ্যান্ড আই অ্যাম রেডি টু গো।

কোলকাতায় এসব কি হচ্ছে রে? একের পর এক গন্ডগোলের খবর দেখছি কাগজে। লাস্ট পাঁচ ছ বছরে শহরটা কির’কম ভায়োলেন্ট হয়ে উঠেছে।

~ তৃষিত

(১৬)

তৃষিত,

একটা খবর দেওয়ার আছে রে তোকে।

তোর সাথে বোধহয় আর দেখা হচ্ছেনা। আমি মুম্বই চলে যাচ্ছি। ওখানের একটা এজেন্সিতে একটা অ্যাপ্লিকেশন করেছিলাম। ওরা সিলেক্ট করেছে।

কোলকাতা শহরটার সাথে আমি আর পেরে উঠছিনা। তুই হয়তো বুঝতে পারবি না – কিন্তু এটা ঠিক সেই কোলকাতা নয় যেটায় তুই, আমি, আমরা বড়ো হয়ে উঠেছি।

আমি জানি কোলকাতা খ্যাপামি তোর খুব প্রিয় – কিন্তু সেই খেপামিটা মানুষের দিকে তাক করে ছুটে এলে মানুষকে তো হাত পা গুটিয়ে বসে থাকতে হয়। সেভাবে আমি বাঁচতে পারবো না রে।

 

‘প্রিয় বন্ধু’র অর্ণব-জয়ির মতো তাই এই মেলেই চলুক – চলতে থাকুক।

আর তুইই তো বলেছিলি – মুম্বই তোর খুব ভালো লাগে।

 

~শাল্মলী

 

(১৭)

শাল্মলী,

চিঠিটা – কোলকাতা থেকে লিখছি।

তোর সাথে দেখা না করার জন্য শহরটায় যে কিছু মিসিং নয় সেটা আর বলি কি করে?কিন্তু সেকথা নাহয় পরে হবে।

তোর কোলকাতা ছেড়ে যাবার কারণটা আমাকে কতটা হন্ট করেছে বুঝতে পারছি না। আসলে সময়টা পাল্টাচ্ছে-পারিপার্শ্বিকটাও। আইপিএলের ধুমধাড়াক্কা ম্যাচের মতো আমরা সবকিছু বড্ডো তাড়াতাড়ি ছুঁতে চাইছি।

সেদিন বস্টনে একটা বোমা ফাটলো – ম্যারাথনের দৌড়ে। যে ম্যারাথন এককালে গ্রিসে মানুষের সৌহার্দ বাড়াতে অলিম্পিকের শেষ ইভেন্ট হতো।

আজকেও ফেসবুকে দেখলাম দিল্লীতে একটা পাঁচ বছরের মেয়েকে রেপ করে খুন করা হয়েছে।

আমার এককালে মানুষের উপর খুব বিশ্বাস ছিলো জানিস? সেটা খুব অঞ্জন দত্তের ভক্ত হবার জন্য কিনা জানিনা – কিন্তু আমার মনে হতো ওঁর সিনেমার মতোই মানুষগুলো আসলে ওপর ওপর যতই শঠতা দেখাক না কেন – খোঁচা মারলেই ভালো মানুষগুলো বেরিয়ে আসে।

পৃথিবীটা কি পালটে যাচ্ছে, গ্লোবাল ওয়ার্মিংটা কি পরিবেশের সাথে সাথে মানুষের জিনগুলোকেও উলটে পালটে দিচ্ছে। আমরা কি যাদের নিয়ে কথা বলছি তারা সত্যি সত্যি মানুষ?

জানিনা।

তবে এটুকু জানি আমার কাছে তোর এই মেলগুলো রয়েছে-যেগুলো আমি দরকার পড়লে কোলকাতার প্রত্যেকটা দেওয়ালে সেঁটে দিয়ে আসবো-খবরের কাগজের ভাঁজে গুঁজে দেবো-প্লেন বানিয়ে আকাশে ভাসিয়ে দেবো-এই মেলগুলো আছে-আমি ভালো আছি-কোলকাতা? সেটাও বেঁচে বর্তেই আছে।

রবীন্দ্রনাথকেই বা অগ্রাহ্য করতে পেরেছি কবে? এই কবিতাটা পড়েছিস বোধহয়। তবু দিলাম – দেখিস-

“আমরা দুজন একটি গাঁয়ে থাকি,

সেই আমাদের একটিমাত্র সুখ।

তাদের গাছে গায় যে দোয়েল পাখি

তাহার গানে আমার নাচে বুক।

তাহার দুটি পালন-করা ভেড়া

চরে বেড়ায় মোদের বটমূলে,

যদি ভাঙে আমার ক্ষেতের বেড়া

কোলের ‘পরে নিই তাহারে তুলে।

 

আমাদের এই গ্রামের নামটি খঞ্জনা,

আমাদের এই নদীর নামটি অঞ্জনা,

আমার নাম তো জানে গাঁয়ের পাঁচজনে,

আমাদের সেই তাহার নামটি…”

 

~তৃষিত

Latest posts by কৌস্তভ ভট্টাচার্য্য (see all)