গোলগাল মহিলা, বয়স চল্লিশের ঠিক কোনদিকে বলতে পারি না। কিন্তু যে দিকেই হোক, খুব বেশী দূরে নয়। বেশ বোঝা যায় একসময়ে সুন্দরী ছিলেন। হয়তো এখনও আছেন, কিন্তু উগ্র প্রসাধনের আড়ালে সেটা আর বোঝবার জো রাখেন নি। শরীরের সাজপোশাক আর চাকচিক্যে অর্থাভাবের কোন চিহ্ন নেই। মুখে শুধু গভীর উদ্বেগ। দ্রুতপায়ে রাস্তাটা পেরিয়ে এসে আমাদের বাড়ীর সামনে একবার দাঁড়ালেন। বাইরে সাইনবোর্ডের দিকে একবার দেখে একটু ইতস্তত করে একেবারে ঢুকে পড়লেন আমি যেখানে কাজ করছিলাম।

পুরীর সমুদ্রে একবার জলের তোড়ে খানিকটা ভেসে গেছিলাম। বেশ খানিক নাকানি-চোবানি খেয়ে প্রাণে বেঁচেছিলাম। ভদ্রমহিলা ঘরে ঢুকে মুখ খুলতেই সেই অনুভূতি যেন আবার হল। পার্থক্যের মধ্যে এবার জলের তোড় নয়, বাক্যের স্রোত। অনর্গল, অপ্রতিহত, অদম্য!

-‘কি বলবো ডাক্তারবাবু, আমার বড় বিপদ। আপনার নাম শুনে অনেকদূর থেকে আসা, এখন আপনিই ভরসা। দেখুন যদি কিছু করতে পারেন। কত ডাক্তার, কত কবিরাজ দেখিয়েছি। কত সাধু-সন্ত, বাবাজীর মাদুলি-কবচ পরেছি। কিছুতেই ঠিক হবার নাম নেই। গত হপ্তায় সেজমাসীর কাছে শুনলাম, …সেজমাসী, আমার মায়ের পরের বোন বেলগাছিয়ায় থাকেন। মেশোমসাইয়ের আবার বড় ব্যবসা, গড়িয়াহাটায় বম্বে ডাইং-এর বিশাল শোরুম। তা সেই মাসীর কাছে শুনলাম, গত জানুয়ারীতে একেবারে মরার মুখ থেকে আপনি তাকে ফিরিয়ে এনেছেন। মাসী তো আপনার প্রশংসায় পঞ্চমুখ, কথা আর শেষ হয় না। আমি আবার অতো কথা বলতে পারি না। আমি জানতাম, মাসীর রোগ-রোগ বাতিক আছে। একলা ঢোল-কাঁসির সংসার তো, দুই ছেলে বিদেশে সেটেল্ড। বড় কানাডায় আর ছোট জারমানিতে…এই তো আমার ছোটছেলের জন্মদিনে এক বিশাল টেডি পাঠিয়েছিল।… তা মাসী আর কি করে, একা সারাদিন শরীর নিয়েই আছে। আমি তো আর সেরকম নই। কিন্তু মরণাপন্ন হলে মানুষের প্রাণে ভয় তো হবেই, তাই না ডাক্তারবাবু? মাসীর কথা শুনে ভাবলাম, কতো তো করলাম। একবার শেষ চেষ্টা করেই দেখি। তাই অনেক আশা নিয়ে আপনার কাছে ছুটে এসেছি ডাক্তারবাবু, আপনি আমায় বাঁচান।’

বোধহয় দম নিতেই ভদ্রমহিলাকে একটু থামতে হল। মরণাপন্ন রুগীর মুখে ঠিক এরকম কথার ফুলঝুরি ছুটবে বলে তো মনে হয় না। আমি বুঝে গেছি সমস্যাটা আসলে কোথায়। মহিলার স্বামীর কথা ভেবে বেশ খারাপ লাগলো। বাড়ীর বাইরে ভদ্রলোকের মেজাজ নিশ্চই তিরিক্ষি হয়ে থাকে। আমাদের অনির্বাণদার মত। বাড়ীতে বৌদির সামনে কেঁচো হয়ে থাকা অনির্বাণদা গায়ের ঝালটা ঝাড়তেন অফিসে সাবর্ডিনেটদের ওপর চোটপাট করে। একটু সুযোগ পেয়ে কিছু একটা দিয়ে বাক্যস্রোত বন্ধ করতেই বললাম, ‘আপনার স্বামী আসেন নি সঙ্গে?’

স্বামীর কথায় একগাল হেসে তিনি বললেন, ‘আসে নি আবার, ওই তো রাস্তার ওপারে…’ এই বলে জানলায় গলা বাড়িয়ে দেখেই ভদ্রমহিলার মুখের চেহারা পালটে গেল, ‘দেখেছ, আমি এখানে ঢুকেছি আর অমনি হাওয়া হয়েছে।’

ভদ্রলোকের অযথা হেনস্তা যাতে না হয়, তাই তাড়াতাড়ি বললাম, ‘না না, আমি তো দেখেছি। রাস্তার ওপারে এক ভদ্রলোক অনেকক্ষণ এদিকেই দেখছিলেন বটে।’

-‘ভদ্রলোক আবার কোথায়? ওই তো আমার স্বামী।’ ওনার স্বামীর ভদ্রলোক হতে বাধাটা কোথায় ঠিক ধরতে পারলাম না। আমাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই আবার শুরু হয়ে গেল, ‘আর পারি না ডাক্তারবাবু, অনেক দিন সহ্য করছি। আর সহ্য হচ্ছে না। আচ্ছা, কতদিন এভাবে চলবে বলুন তো? আপনার কি মনে হয় সব ঠিক হয়ে যাবে? আমার তো আর বিশ্বাস নেই। মনে হয় পালটেই ফেলতে হবে, তাই না ডাক্তারবাবু?’

প্রথমটা ভেবেছিলাম ওনার স্বামীর সম্বন্ধে বলছেন। তারপর বুঝলাম এটা ওঁর হাঁটুর ব্যথার কথা। ভদ্রমহিলা অবশ্য ততোক্ষণে প্রসঙ্গ পালটে সত্যিই স্বামীর কথা শুরু করে দিয়েছেন, ‘এই নিয়ে আমার স্বামীর সঙ্গে খুব তর্কাতর্কি হয়, জানেন? আমি ছাড়বো কেন, শুনিয়ে দিই, তোমার হাতে পড়েই আমার এই দুগগতি, অবশ্য এমনি এমনি বলি,’ ভদ্রমহিলা একটু মুচকি হেসে বললেন, ‘আমার স্বামী বলতে নেই আমাকে খু-উ-ব ভালবাসে। আর কথা… ওঃ কি কথাই না বলতে পারে! সর্বক্ষণ বকে চলেছে। সময়-তারিখের খেয়াল নেই, কোন সাব্জেক্ট থাক আর না থাক সমানে বকবক বকবক…। তা যাকগে, সবাই তো আর আমার মত হবে না, কি বলেন? আমার কথা শুনে, এমন পাজি, কি বলে জানেন? বলে, তুমি দিন দিন যেরকম শুকিয়ে যাচ্ছ, ওইটুকু টুকু দু’টো পায়ের আর দোষ কি? চারটে পা থাকলে আর কোন ব্যথা থাকতো না।’ এই বলে মহিলা স্বামীর রসিকতায় নিজেই হেসে গড়িয়ে পড়লেন।

ভদ্রলোকের সাহসের প্রশংসা করতে হয়। এটুকু সময়েই আমার মাথা ঘুরছিল, আর উনি একই বাড়ীতে বাস করেও অতোটা রসবোধ বজায় রেখেছিলেন! বোধহয় রেখেছিলেন বলেই মূর্তিমান সাইক্লোনের সামনেও এখনও ভেসে যান নি। ভদ্রমহিলার আবার একটু দম নেবার সুবাদে আমি অতিকষ্টে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনার পায়ের ব্যথা ছাড়া আর কোন প্রব্লেম নেই তো?’

বলে ফেলেই বুঝতে পারলাম নিজের অজান্তেই সর্বনাশ ডেকে এনেছি। ভিসুভিয়াস আগ্নেয়গিরির মত আবার বাক্যের অগ্নুৎপাত শুরু হয়ে গেল, ‘কি বলছেন ডাক্তারবাবু, সমস্যা কি আমার একটা? একেক সময় ভাবি, আমার এইটুকু শরীরে এত রোগ কোথা থেকে যে এসে বাসা করেছে! আপনি বুঝতে পারছেন না, আমি কি ভীষণ রোগা হয়ে যাচ্ছি? (এই সময়ে আমার একটু বিষম লেগে গেল। আর কেউ থাকলে ঠিক বুঝে যেত সেটা হঠাৎ গুলিয়ে ওঠা হাসি চাপতে গিয়ে, কিন্তু ভাগ্য ভালো, মহিলা বুঝতে পারলেন না)… আহা বিষম লাগলো, ষাট ষাট। তা যে কথা বলছিলাম… আপনি জানেন গত তিন মাসে আমার ওজন কতো কমে গেছে?’

ভদ্রমহিলা আমাকে যেন কঠিন পরীক্ষার প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেছেন, এইভাবে হতাশকণ্ঠে বললাম, ‘কতো? দশ কেজি?’

-‘কি যে বলেন ডাক্তারবাবু, তাহলে আপনার সামনে আর আমাকে দেখতে পেতেন?… অতোটা নয়, কিন্তু পুরো আধ কিলো কমে গেছে। আপনাকে বললাম না ডাক্তারবাবু, আমার স্বামী কিরকম চিন্তায় পড়ে গেছে?’

মহিলার স্বামীর চিন্তায় দুঃখবোধ করতেই যাচ্ছিলাম, কিন্তু সে সময় তিনি দিলেন না, তার আগেই তিনি আবার শুরু করে দিয়েছেন, ‘আসলে কি জানেন তো, একদম খাওয়ায় রুচি নেই। আগে ব্রেকফাস্টে হেসেখেলে আটটা বাটার-টোস্ট খেতে পারতাম, এখন পাঁচটার পরেই আইঢাই করে। কত্তার মুখ চেয়ে আরও এক-আধটা খেয়ে নিই অবশ্য, কিন্তু আপনিই বলুন এভাবে আর কদিন চলবে?… আর সেদিন দুপুরে একটা পার্টি ছিল, লাঞ্চের পরে, … হ্যাঁ লাঞ্চটা বেশ জমাটি হয়েছিল বটে, …সিনেমায় গিয়ে মাত্র এক প্যাকেট চিপ্স আর একটা বাটার-স্কচ ছাড়া আর কিচ্ছু দাঁতে কাটতে পারলাম না। আমার অবস্থাটা বুঝতে পারছেন তো? … খাওয়া-দাওয়ার যখন এই অবস্থা তখন ঘুমেরও… বুঝতেই পারছেন…’ এই বলতেই ভদ্রমহিলার আশঙ্কিত মুখে হঠাৎ ফিক করে একটু হাসি ফুটলো। লজ্জিত মুখে বললেন, ‘সুনন্দার কথা মনে পড়ে গেল ডাক্তারবাবু, মানে ওর বয়-ফ্রেন্ডের কথা…হি হি, … আপনার কাছে আর বলতে কি লজ্জা? একদিন সুনন্দাকে তিনি ফোন করছেন, জানো তোমাকে না দেখে আমি সারা সকাল কিছু খেতে পারি নি। সুনন্দা চোখ গোল করে বলে, ওমা তাই? তখন ছেলেটা বললে, হ্যাঁ, আর জানো, তোমার কথা ভেবে সারা দিন কিছু খেতে পারি নি। সুনন্দা আরও খুশী, বললে, তারপর? ছেলেটা বললে, তারপর আর কি, সারারাত চোখে ঘুম নেই। সুনন্দা কি বোকা নাকি, বলল, নিশ্চই আমার কথা ভেবে? তখন ছেলেটা কি বলে জানেন? বললে, না, ক্ষিদের চোটে। ভাবুন একবার…’ বলতে বলতে হি হি করে ভদ্রমহিলার সেকি হাসি।

তারপরেই অবশ্য হাসি মিলিয়ে গিয়ে আবার করুণস্বরে বললেন, ‘কি করি বলুন তো ডাক্তারবাবু, এতো কম ঘুমিয়ে আমি…?’

আমি বাধা দিয়ে বললাম, ‘সারারাত ঘুমোতে পারেন না?’

-‘না, রাতে ঘুম অবশ্য ভালোই হয়,’ ভদ্রমহিলার কণ্ঠস্বর বেশ চিন্তান্বিত, ‘আর বলতে নেই দুপুরেও খাবার পরে চোখদু’টো আপনিই জুড়ে আসে। এইটুকু ছাড়া সকালে আর সন্ধ্যেয় কিন্তু কিছুতেই ঘুম আসতে চায় না!’

আর একটু হলেই আমার আবার বিষম লাগতো, তার আগেই একটা মৃদু কেঁউ কেঁউ শব্দ শুনতে পেয়ে দেখি, ভদ্রমহিলার বাঁ হাতের নীচে কি একটা যেন নড়ছে। আরে! এটা তো একটা ছোট্ট কুকুর! আমি তো এতক্ষণ ভেবেছিলাম ভ্যানিটি ব্যাগ! সঙ্গে সঙ্গে মহিলা কপট ধমক লাগালেন, ‘টক্সি…তুমি আবার দুষ্টুমি করছ? আমি ডাক্তারবাবুর সাথে দরকারী কথা বলছি না, এখন একদম চুপটি করে থাকো।’

আমি আবার ভুল করে বলে ফেলেছি, ‘আরে ওটা কুকুর?’ ব্যাস আর যায় কোথায়? ভদ্রমহিলা অগ্নিদৃষ্টিতে আমাকে প্রায় ভস্ম করে বললেন, ‘কি বললেন আপনি, টক্সিকে আপনি কুকুর বললেন? ও কুকুর? জানেন ও আমার মেয়ের মত? (আমার মুখে এসে গেছিল, তাই তো, মেয়ের মুখ যে একেবারে মায়ের মত। ভাগ্যিস বলে ফেলি নি!) ও আমার সাথে খায়, আমার সাথে ঘুমোয়, আবার এমন লজ্জা…হি হি… আমার হাতে ছাড়া চান করবে না।…আর ডাক্তারবাবু, আপনি জানেন ওর পেডিগ্রি? ও যদি কথা বলতে পারত, আপনার আমার মত লোকের সাথে… ইয়ে…ও কথাই বলত না!…আবার জানেন আমার টক্সি কতো কাজের? বাড়ীতে কেউ ঢুকলেই ঠিক জানিয়ে দেয়।’

 -‘কি করে? ডেকে?’

-‘না না, ওকে কি রাস্তার পাহারাদার কুকুর ভেবেছেন? কেউ বাড়ীতে ঢুকলেই ও সোজা গিয়ে সোফার তলায় লুকোয়।’ ভদ্রমহিলা আহ্লাদে গলে গেলেন, ‘ভীতুর ডিম একটা। জানেন, কতো শিখিয়েছি ওরকম করে না। কিছুতেই শিখবে না।’ আদরের আতিশয্যে অবাধ্য টক্সির গালে তিনি একটি চুমু দিয়ে দিলেন।

-‘আপনার স্বামীও কিছু বলেন না?’ আমি ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করি।

-‘ওমা বলে না আবার?’ ভদ্রমহিলা একগাল হেসে ব্যক্ত করেন, ‘ও কতো বলে, সোফার পেছনে আমারই লুকোবার জায়গা হয় না, আবার তুমি কেন আসছ টক্সি? তা কে কার কথা শোনে?’

ভদ্রমহিলা তাঁর টক্সির গুণপনা বর্ণনা করে যেন ক্লান্ত হয়েই একটু চুপ করলেন। তারপর আবার তাঁর মুখে ঘনিয়ে এলো চিন্তার ছায়া, ‘আচ্ছা ডাক্তারবাবু, বলুন না আমি আবার ঠিক হবো তো? একটু ভালো করে চেক-আপ করে দেখুন না ডাক্তারবাবু?’

আমতা আমতা করে বলতে গেলাম, ‘ইয়ে, মনে হচ্ছে বিশ্রাম দরকার…।’ ততক্ষণে ভদ্রমহিলা ‘অন্তত জিবটা তো একবার দেখুন।’ বলে এত্তবড় জিব বার কর মা কালী হয়ে গেছেন। আমারও মুখ ফস্কে বেরিয়ে গেল, ‘ওটারই বিশ্রামের বিশেষ প্রয়োজন।’

মহিলা জিব গুটিয়ে করুণ মুখে বললেন, ‘অসুস্থ মানুষটার সঙ্গে রসিকতা কচ্ছেন, ডাক্তারবাবু? সিরিয়াসলি একটু বলুন না, আমি কি করবো?’

এইবার দেখলাম সত্যিই তিনি আমার উত্তর শোনবার জন্যে অপেক্ষা করছেন। আর সুযোগের অপচয় না করে বলে ফেললাম, ‘আদৌ রসিকতা করছি না ম্যাডাম। একটা নয়, আমি আপাতত আপনাকে তিনটে অ্যাডভাইস দিতে পারি। যদি শোনেন নিশ্চই উপকার পাবেন। প্রথম, আপনি অন্তত পনের কেজি ওজন কমান, পায়ের ব্যথা কমে যাবে। দ্বিতীয়, মেক-আপটা একটু কম করুন, আপনার স্বামী খুব খুশী হবেন। আর শেষেরটাই হল সবচেয়ে জরুরী। কিছু মনে করবেন না, আপনি ভুল জায়গায় এসে পড়েছেন। আমি এক সামান্য লেখক। এবার নিজের কাজ করতে চাই। আপনি দয়া করে এই সিঁড়ি দিয়ে ওপরে চলে যান। ডক্টর বাসুর চেম্বারটা ওখানেই পেয়ে যাবেন।’

Latest posts by সূর্যনাথ ভট্টাচার্য (see all)