ছায়াছবির সঙ্গী – অ আ এবং ই ঈ (২)

আগের পর্ব


জল্পনা চলছিল টেলিভিশন ধারাবাহিকের, সেসব শিকেয় তুলে, শুরু হ’ল নতুন চলচ্ছবির কাজ। যদিও তখন সব কাজই আমার কাছে নতুন এবং সমান আকর্ষনীয়, তবু সেলুলয়েডে পরিপূর্ণ একটি চলচ্ছবি তৈরী হবে এবং আমি তার অংশীদার, এটা ভেবেই উত্তেজিত হয়ে পড়লাম।

ছবিটির নাম ছিল ‘অপূর্ণ’। ষোলো মিলিমিটার ফর্মাটে চলচ্চিত্রায়িত হয়েছিল। ক্যামেরাম্যান ছিলেন বিখ্যাত কানাই দে। কানাই দা যে একজন কি অসাধারণ মানুষ না মিশলে বোঝা যায় না। কাজের ব্যাপারে যেমন নিঁখুত হবার চেষ্টা সব সময়, আবার তাঁর জ্ঞান ছোটদের মধ্যে বিলিয়ে দেবার একটা দারুন আগ্রহ। এমনই আর একজন মানুষকে পরবর্ত্তী সময় পেয়েছিলাম, যিনি, শেখাতে ভালোবাসেন, শিখিয়ে আনন্দ পান, তাঁর নাম আদিনাথ দাস।

কানাই দা
কানাই দা

অবসর সময় কানাই দা আমাদের অনেক গল্প বলতেন। এবং গল্পের মাধ্যমেই শেখাতেন চলচ্ছবিতে কিভাবে কোন মূহুর্ত্ত তৈরী করেছেন। উনি অনেক বিখ্যাত চলচ্চিত্রের মধ্যে ‘সপ্তপদী’ র-ও আলোকচিত্রী দলের একজন ছিলেন। তখনতো, তখন কেন, পরবর্ত্তী সময় আমারও দেখা, অনেকদিন পর্যন্ত উন্নত কারিগরী আমাদের হাতে এসে পৌঁছয়নি বা আমাদের আয়ত্তের মধ্যে ছিলনা। তখন বিভিন্ন উপায় মাথা খাটিয়ে বের করতে হ’ত, কিভাবে উপযুক্ত দৃশ্যটি চলচ্চিত্রায়িত করা যায়।

কার্ডবোর্ডে জানলার জাফরি কেটে, তার মধ্যে দিয়ে সুচিত্রা সেন এর মুখের ওপর আলো ফেলে এবং সেই জাফরি দ্রুত এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে অপসারিত করে, ট্রেন চলে যাবার দৃশ্যটি তৈরী করেছিলেন কানাই দা। পরবর্তীতে শব্দ সংযোজনা তাকে আরো জীবন্ত করেছে।

এমন অজস্র গল্প বলতেন কানাই দা। তাকে আরো কাছ থেকে পেয়েছিলাম ‘বিবাহ অভিযান’ চলচ্চিত্রায়নের সময়। সে কথা পড়ে বলব।

কানাই দা আমায় ভালোবাসতেন, স্নেহ করতেন। সত্যিকথা বলতে কি, তখন কাজ করতে এসে, সকলের উষ্ণ হৃদয়ের ছোঁয়ায় যেভাবে নিজেকে মেলে ধরতে পেরেছি, যেভাবে হাতে ধরিয়ে তাঁরা কাজ শিখিয়েছেন বা কাছে টেনে নিয়েছেন, আজকাল তার অভাব বোধ করি। এখন বুঝি সেই মানুষগুলো অনেক অনেক বড় মাপের মানুষ ছিলেন। অত বিখ্যাত মানুষরা আমার মত সদ্য কাজ করতে আসা একটা ছোট ছেলেকে অমন আপন করে নিয়েছিলেন বলেই হয়ত, আমার মানষিক বেড়ে ওঠাটাও উদার করতে পেরেছি।

কথা প্রসঙ্গে কানাই দা’র কথা এসে গেল তাই, তা না হ’লে, যে মানুষটি আমায় পরিচালনা বিভাগের, সহকারীর কাজের খুঁটিনাটি যত্ন নিয়ে প্রথম শিখিয়েছিলেন, দেব দত্ত দা, তাঁর নাম প্রথমে করা উচিত ছিল। অদ্ভুত, কেন জানিনা, ওঁনার পুরো নাম ধরেই সবাই ডাকত। আমিও ডাকতাম দেব দত্ত দা। দেবকুমার দা’র ডাকনাম নিশ্চয়ই দেবু হতে পারে। গুরুজন বা বন্ধু স্থানীয় কেউ ডাকতেও পারে। আমি কাউকে ডাকতে শুনিনি, মানে তেমন কারো সাথে দেখা হয়নি। দেবকুমার দা, দেব দত্ত দা’কে দেবু ব’লে সম্বোধন করতেন এবং তুই বলতেন।

দেবদত্ত'দা
দেবদত্ত’দা

দেব দত্ত দা ছিলেন দেবকুমার দা’র প্রধান সহকারী। উনি ঋত্তিক ঘটকের শেষজীবনের কিছু কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এই দেব দত্ত দা আমায় আক্ষরিক অর্থে হাতে ধরে একটা একটা করে বিষয়ে শিখিয়েছেন।

প্রথমে চিত্রনাট্যকে বিভিন্ন স্থান, কাল, পাত্র অনুযায়ী ভাগ করে নিতে হয়। স্থান মানে শোবার ঘর না বসার ঘর না রান্না ঘর অথবা রাস্তা না নদীবক্ষ না খেলার মাঠ ইত্যাদি ইত্যাদি। আর কাল মানে, দিন না রাত। তারও রকমফের আছে, ঊষা কিনা, গোধূলি কিনা। মধ্যরাত কিনা বা নির্জন দুপুর কিনা। মনে হতে পারে, দিন রাতের অবস্থা্‌ ঘরের মধ্যে আর কিই বা পরিবর্তিত হবে? এ ব্যাপারে চলচ্চিত্রের জগতে একটা মজার কথা প্রচলিত আছ্, টেবল ল্যাম্প জ্বললে রাত, নয়তো দিন।

কিন্তু মজা বাদ দিয়ে বলছি, খেয়াল করে দেখবেন, রাতে হয়ত বিশেষ নয়, দিনের বিভিন্ন সময়, ঘরের আলোর তারতম্য হয়। ঘরের কোন দিক পুব দিক বলে মানা হবে, ঠিক করে, সেই অনুযায়ী চলচ্চিত্রের ঘর’এর আলো বানানো হয়। হ্যাঁ আলো বানানোই বলব। এই হুবহু আলো বানানোর ক্ষমতা যার যত বেশী সে তত বড় আলোকচিত্রী। তবে ধরে নেবেন না চলচ্চিত্রে সব সময় বাস্তববাদী আলোই বানানো হয়। চিত্রনাট্যের চাহিদা অনুযায়ী, কখনও কখনও, অবাস্তব ম্যাজিকাল আলোরও ব্যাবহার হয়।

সময়ের সাথে সাথে যেমন আলোর পরিবর্তন হয়, আরো পরিবর্তন হয় শব্দের। নির্জন দুপুরের সাথে, ব্যাস্ত সকালের শব্দ মিলবে না। বা বিকেলের ঘরে ফেরা পাখীদের কলরব, গভীর রাতে দূর থেকে ভেসে আসা কুকুরের ডাক হয়ে যাবে। শব্দ সংযোজনা ব্যাপারটা যদিও শুটিং পরবর্তী একটা অধ্যায়, তবুও ভাবনা চিন্তাগুলো প্রথমেই করে রাখা উচিত।

এই যে চিত্রনাট্য পড়ে, বিভিন্ন জিনিষ মাথায় রেখে, দৃশ্যগুলোকে ভাঙতে হয়, এবং শুটিং কবে, কি করব, সাজিয়ে নিতে হয়, তাকে চলচ্চিত্রের ভাষায় বলা হয় শুটিং সিডিউল। তা এই দেব দত্ত দা’ই আমায় শিখিয়েছিলেন।

চলচ্চিত্রে একটি দৃশ্যের আলো সাজানো, একটা সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। তাই, একই আলোতে কত বেশী সংখ্যক দৃশ্য চিত্রায়ন করা যেতে পারে, তাও-ও দেখা প্রয়োজন। যেমন, ধরা যাক, শোবার ঘরে দিনের আলো বানানো হ’লে, সমস্ত চিত্রনাট্য জুড়ে ক’টি দিনের দৃশ্য আছে, তা বের করে পর পর শুটিং করা বাঞ্ছনিয়। দৃশ্য বদলের জন্য পোষাক পাল্টাতে পারে, মেক আপ বদলাতে পারে, অভিনেতা-অভিনেত্রী পালটে যেতে পারে, সে সব নজর রাখতে হবে। এবং সব কান্ডটাই ঐ শুটিং সিডিউল তৈরীর সময়েই করতে হবে। সে অনুযায়ী অভিনেতা-অভিনেত্রীদের শুটিং তারিখ জানাতে হবে। বুঝতেই পারছেন ব্যাপারটা কত জটিল। সেটা ঠান্ডা মাথায় করতে হয়।

একটা মজার টেকনিকাল ব্যাপার উল্লেখ করে আজকের লেখা শেষ করব। ক্যামেরাকে ঝাঁকুনিমুক্ত আগুপিছু করার জন্য ট্রলির ওপর বসাতে হয়। ট্রলি হ’ল, শুটিং এর রেল লাইন। দুটো সমান্তরাল পাইপের ওপর, রাবারের চাকা লাগানো একটা পাটাতনকে ট্রলি বলে। তার ওপর ক্যামেরা সমেত আলোকচিত্রী একা বা তার সঙ্গে তার সহকারীও উঠে পড়েন। একজন সেই ট্রলিকে ঠেলেন বা টানেন।

এই ট্রলি যখন চক্রাকারে ঘোরে, তাকে বলা হয় সার্কুলার ট্রলি। এই সার্কুলার ট্রলি এক বা একাধিক চরিত্রকে অনুসরণ করে যখন চক্রাকারে ঘুরপাক খেতে থাকে, তখন, আমাদের কলাকুশলীদের, ঐ ট্রলির আগে আগে বা পিছে পিছে দৌড়তে হয়। কারণ, ক্যামেরা তো তখন তিনশ ষাট ডিগ্রি ঘুরে যাচ্ছে, চিত্রনাট্যের বাইরের কারো থাকা তো চলবে না। দর্শক দৃশ্যটি দেখবার সময় এটি টের পান না। কিন্তু এই দৃশ্যগ্রহণ পর্বটি বেশ হাস্যকর হয়। প্রথম ছবিতেই আমার এই অভিজ্ঞতা হয়ে যায়, কারণ সেখানে এমন একটা দৃশ্য ছিল। সেখানে দুটি চরিত্র টিটো দা মানে দীপঙ্কর দা আর দীপন কথা বলতে বলতে সকালে জগিং করছেন। সেই শটটি গ্রহনের প্রস্তুতি চলছে দেখা যাচ্ছে নিচের ছবিটিতে।

শট গ্রহনের প্রস্তুতি
শট গ্রহনের প্রস্তুতি

পরের পর্ব