অষ্টমীর দিন সকালে অঞ্জলি দিতে দিতে কেমন আনমনা হয়ে গেল মৈনাক। পুজোর কটা দিন তার হৃদয়টা বড় হয়ে যায় – যে যা চায় দিয়ে দিতে ইচ্ছে করে। অথচ খোদ পুজোর মণ্ডপে যেন ঠিক তার উল্টোটা। সবাই ফুল বেলপাতা কচলে মাইকে বাজা মন্ত্রের সাথে তাল মিলিয়ে তারস্বরে চাইছে- “আয়ুর্দেহি, যশোদেহি, ধনং দেহি ইত্যাদি”। কান পেতে শুনলে মনে হচ্ছে মা দুর্গার কাছে এ তো একরকম ভিক্ষাই – তোমার ঝুলিতে যা যা আছে তা সব আমার ঝুলিতে দেহি দেহি। কেউ বুঝে, কেউ না বুঝে হলেও মুখে সবাই একই কথা বলে চলেছে। তাহলে মনে মনে আরও কত কি চাইছে কে জানে। এসবের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতে তীব্র অস্বস্তি লাগছিল মৈনাকের – সবাই যেটুকু পেয়েছে, তার বেশী আর কিই বা পাবে – তাও আবার বছরের মধ্যে একটা দিন এরকম গদগদ প্রার্থনায়? কিরকম খাপছাড়া যেন এই চাওয়া পাওয়ার হিসেব। মাইক বলছে, “এবারে প্রণাম করুন।” সবাই মাথা নিচু করছে, এবার শুরু হবে ফিস ফিস করে নির্লজ্জ  আরেক ধাপ চাওয়া। প্রমোশন দাও, গাড়ি দাও, সুন্দরী বউ দাও, ফুটফুটে বাচ্চা দাও। তার মধ্যে আবার পুত্র সন্তানের জন্য আলাদা করে চাওয়া তো মন্ত্রেই আছে। যত্তসব ন্যাকামো।

সকাল সকাল অঞ্জলি দেওয়া হয়ে গেলেও চুঁইচুঁই করা খালি পেট নিয়ে অনেকক্ষণ দুর্গামন্দিরে দাঁড়িয়ে রইল মৈনাক। মন্দির মানে এ ঠিক মন্দির নয় – কারন এখানে সারা বছর কোন প্রতিমা থাকে না বা  নিয়মিত পুজোও হয় না। আসলে আগে যে জমিতে পাড়ার পুজো হত, সেই জায়গাতেই কমিটি একটা হলঘর বানিয়ে নিয়েছে। জমি আদতে কার ছিল কেউ জানে না, তবে সেই জমিতে বছরের পর বছর পুজো করতে করতে জায়গাটা পুজো কমিটিরই মৌরুশিপাট্টা হয়ে গেছে। আর এদিকে মন্দির গজিয়ে ওঠায় বছরের পর বছর প্যান্ডেল করার খরচটাও বেঁচে যাচ্ছে। শুধু মৈনাকদের পাড়াতেই না, আজকাল মফঃস্বলের অনেক পাড়াতেই দেখা যাচ্ছে যে এরকম মন্দির গজিয়ে উঠছে। সব জায়গার ছবিটা মোটামুটি একই। দিন দিন খরচ যেহারে বাড়ছে, তাতে সব বজায় রেখে পুজো করাই মুশকিল। এর মধ্যে একফোঁটা স্বস্তি এই মন্দির। এতে আড্ডা দেওয়ারও একটা ভালো জায়গা হয়েছে।

খানিকক্ষণ পাঞ্জাবী পরে ঘেমে ওঠার পর মৈনাকের মুখে হাসি ফুটল। পেটের মধ্যে অস্থির করা, জ্বালা ধরানো খিদেটাও একটু বাগে এলো – হেলে দুলে মন্দিরের দিকে এগিয়ে আসছে পূর্বা। সবুজ শাড়ি, খাটো ব্লাউজ – সেই মুহুর্তে মৈনাকের মনে হল পূর্বা যাই-ই পরুক না কেন, তাতেই ওকে ফাটাফাটি মানাবে। মৈনাক হাসল একটু – নার্ভাসনেস আর ক্যাবলামো মেশানো হাসি। আদপে এটা ইনট্রোডাকশানের একটা সহজ পাঠ – অহেতুক স্মার্ট দেখার তো দরকার নেই, বরং একজন ডাকসাইটে সুন্দরীর সামনে আড়স্ট হয়ে আসাটাই তো স্বাভাবিক। পূর্বাও একটা হাসিতে উত্তর দিল। পূর্বার সাথে আসা দুই বান্ধবী একটু এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল।

সামনা সামনি এটাই প্রথম দেখা। যদিও একচোট আলাপ আগেই হয়েছে – ফেসবুকে। আজকাল পাড়ার পুজো কমিটির একটা ফেসবুক গ্রুপ হয়েছে। সেখানে পুজোর প্রস্তুতি থেকে শেষ হওয়া অবধি এক এক করে সব খবর পোস্ট হতে থাকে – ঠাকুর অর্ডার দেওয়া, ঠাকুর আনার হুলস্থূল যজ্ঞ, পুজোর নির্ঘণ্ট, হিসেব নিকেশ আরও কত কি। যবে থেকে মন্দির তৈরি হওয়া শুরু হয়েছে, তবে থেকে আরও বেশি করে শুরু হয়েছে এই কার্যকলাপ। সেই গ্রুপেই সে মহালয়ার দিন পূর্বাকে প্রথম দেখেছে সবাইকে একটা উইশ করতে। তারপর থেকে টুকটাক দু একটা কথাও হয়েছে। ফেসবুক এখন একটা অন্য জগত। সেখানে লজ্জা নেই, একটা মেয়ের সাথে নতুন আলাপ করতে গিয়ে জিভ জড়িয়ে ফেলা নেই। প্রথম সামনা সামনি আলাপ করার জন্য সে মুখিয়ে ছিল। সপ্তমীতে দেখা পায়নি, তবে অষ্টমীতে অঞ্জলি দিতে আসতে দেখা যাবে না তাও কি হয়? পূর্বাকে এগিয়ে আসতে দেখে মনে হচ্ছিল সেই অপেক্ষা সার্থক।

Latest posts by অভ্র পাল (see all)

পাতাগুলি: 1 2 3 4