দেশভাগের কথকতা

দেশভাগের কথকতা

আমাদের শৈশবের দৈত্যদানোদের মধ্যে শচীন চক্কোত্তি খুবই উল্লেখযোগ্য একজন ছিলেন। ছোটখাটো শ্যামলা রঙের মানুষটি তখনকার আর দশজন হিন্দু মানুষের মতই পরতেন ধুতি আর শার্ট। পোশাকের সঙ্গে তাল মেলানো তিনি দেখতে  ছিলেন প্রকৃতই খুব নিরীহ গোছের। কিন্তু তার নিরীহ ছবিটা আমাদের শৈশবে মোটেই নিরীহ মনে হতো না কারণ তিনি ছিলেন আমাদের প্রাইমারি স্কুলের হেডমাস্টার। ফলে তার স্পর্শ এড়ানোর জন্য আমরা সর্বদাই খুবই সতর্ক থাকতাম। আমাদের এই উপমহাদেশের স্বাধীনতা লাভের সময়েই তিনি ম্যাট্রিক পাশ করেন। সেই সময় তার মত বিদ্বান আমাদের দেশ গাঁ’য়ে খুবই বিরল ছিল। ফলে তাঁর যোগ্যতা অনুসারে তাঁর আসন সমাজে বেশ মজবুত ছিল বলেই মনে হত। কিন্তু একে ব্রাহ্মণ তায় বিদ্বান এই মানুষটিকে খুবই খটকা মনে হত। কারণ যখন দেখতাম সাপ্তাহিক হাটের দিন অন্য অনেক পশারীর সঙ্গে হাটের একটা নির্দিষ্ট চালা ঘরের নিচে দোকান সাজিয়ে বসেছেন। দাঁড়িপাল্লায় আধ সের গুড় কিংবা এক পোয়া খেসারির ডাল মেপে দিচ্ছেন। খদ্দেরের সঙ্গে দাম দর নিয়ে রীতিমত তর্কবিতর্ক করছেন। স্কুলের হেডমাস্টারের এই ভূমিকা আমাদের কাছে অনেকটা না মেলা অংকের মত মনে হত। সাপ্তাহিক হাটের এই দোকানটি তাঁর বাড়িতে আবার রোজদিনই চলতো। বাড়িতে যদিও আলাদা কোন দোকান ঘর ছিল না। তাঁদের শোবার ঘরেই থাকতো মালপত্র। খদ্দেরকে তাই উঠোনে দাঁড়িয়েই সওদা করতে হত। তেল নিতে হলে তেলের শিশি নিকনো বারান্দায় রাখতে হত। পাশে পয়সা। বাড়ির লোকেরা সওদা বুঝিয়ে দিত এবং পয়সা গুনে নিত। কিন্তু হাতে হাতে দেয়া নেয়া বারণ, কারণ তাতে ছোঁয়াছুঁয়ি হতে পারে। বাড়িতে উনার শাশুড়ি থাকতেন। তিনি আরও সাংঘাতিক ছিলেন। তিনি আবার দণ্ডায়মান কোন খদ্দেরের ছায়াও মাড়াতেন না। ফলে হয়তো পুকুর ঘাট থেকে ঐসময় তিনি স্নান সেরে ফিরছেন আর নাদান কোন বালক খদ্দের দরোজার মুখোমুখি সওদার আশায় দাঁড়িয়ে আছে এবং সময় মতো যদি সে সরে না দাঁড়ায় তাহলে তীক্ষ্ণ এক গলায় সে নিশ্চিত শুনতে পেত “ক্যাডারে নির্বংইশার পুত খারোইয়া আছস—-সর সর—সইরা যা।”

শচীন চক্কোত্তি আমাদের খুব নিকট প্রতিবেশী। এক গ্রামের শেষটায় আমাদের বাড়ি আর আরেক গ্রামের শুরুতে চক্কোত্তি মহাশয়দের বাড়ি। মাঝখানে ছিল শৈশবের ভয়-জাগানিয়া একটা জঙ্গল। যার মধ্যখান দিয়ে চলে গেছে এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে যাওয়ার আধো অন্ধকার এক বনপথ। ছোটবেলায় যাকে মনে হতো অনেক দীর্ঘ আর শ্বাপদসংকুল। শ্বাপদসংকুল এই জঙ্গল পার হলেই দেখা যেত চক্কোত্তি মহাশয়দের বাড়ি। গ্রামের শুরু এখান থেকে হলেও তারপরের বাড়িঘর বেশ তফাতে। চক্কোত্তি মহাশয়দের বাড়িটাকে তাই একটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মত মনে হতো। আর এই বিচ্ছিন্নতাটা যেন বেশ প্রতীকী। এই বিচ্ছিন্নতাটাই যেন চক্কোত্তি মহাশয়দের কোন ধূসর আভিজাত্যের জানান দিত। আশেপাশের জ্ঞাতিবর্গের ভিটে এখন শূন্য। সবাই দেশ ছেড়ে চলে গেছে। আর এই শূন্য ভিটের মালিক এখন চক্কোত্তি মহাশয়।

এহেন শচীন চক্কোত্তি মহাশয় সম্পর্কে আমরা ক্রমে ক্রমে আরও জানতে পারি যে তিনি তার জ্ঞাতিগোষ্ঠীর মধ্যে একমাত্র যিনি দেশভাগের ডামাডোলের মধ্যেও দেশ ছাড়ার কথা ভাবেননি। দেশ ছাড়ার কথা উঠলে তিনি নাকি রেগেই যেতেন। একে একে আত্মীয় পরিজন বাড়িঘর ছেড়ে যখন চলে যেতেন তখন তিনি একটা কথাই শুধু বলতেন যে মরলে বাপ ঠাকুরদার ভিটেতেই মরবো —বিদেশ বিভূঁইয়ে পথে ঘাটে মরতে চাইনা। উনি তার নিজস্ব ভূগোলের বাইরের সমাজ পৃথিবী মানুষ বা চলমান দেশীয় রাজনীতি সম্পর্কে খুবই উদাসীন ছিলেন। মন্দ লোকেরা অবশ্য অন্য কথা বলতো। বলতো যে প্রচুর ভূ-সম্পত্তির মালিক  হওয়ার একটা সহজ রাস্তা উনি এই সুযোগে পেয়ে গিয়েছিলেন। কারণ তাঁর আত্মীয়রা। তাঁর এই ব্রাহ্মণ আত্মীয়রা তাদের  ভূ-সম্পত্তি হস্তান্তরের ব্যাপারে সবসময় ব্রাহ্মণই খুঁজতেন। ব্রাহ্মণের ভিটেতে আর ছোটলোককে বসতে দেয়া যায় না। তা এত ব্রাহ্মণ কোথায় পাওয়া যাবে ! একে সংখ্যালঘু হিন্দু, তায় তারা আবার হিন্দুদের মধ্যে আর এক সংখ্যালঘু। ফলে ক্রেতা কম। আর আত্মীয় শচীন চক্কোত্তির এটাই ছিল ক্রেতা বিক্রেতার  মাঝে কুড়িয়ে পাওয়া সুযোগ। উনি এক্ষেত্রে কোন ভুল করেননি।

পাতাগুলি: 1 2 3 4