বছরের শুরুতে পড়ে পাওয়া চোদ্দআনার মত এক্সটেন্ডেড শীতে মজে থাকা বাঙালি তখনও শীতের পোশাক তোরঙ্গে তুলে রাখেনি। বড়দিন, নববর্ষের রেশ ততদিনে মিলিয়ে এসেছে। তবে প্রেমিক বসন্তের আগমনবার্তা তখনও এসে পৌছায়নি। এমন সময় শহর মাতাতে হাজির হল কলকাতা বইমেলা। অতঃপর, অন্নপায়ী বঙ্গবাসী চল বইমেলা। চারিদিকে হুজুগের অন্ত নেই। শোনা যাচ্ছিল বইমেলার সময়সীমা নাকি বাড়ছে। বই নিয়ে অনেক রোম্যান্টিকতা থাকলেও বইমেলা নিয়ে আমি খুব একটা আবেগতাড়িত নই। কাজেই ছুটির দিনগুলো হালকা শীতের ওমটুকু মেখেই কাটিয়ে দিচ্ছিলাম। তাই দেখে নিন্দুকে বললো – আমি নাকি কূপমন্ডুক। হবেও বা। নিজেকে তো আর দাঁড়িপাল্লা কষে মেপে দেখিনি। কিন্তু শেষ বেলার শীতে মজে আর বাকি দিনগুলো কাটান গেল না। বইমেলার হুজুগে গা না ভাসালেও, ভেতরে ভেতরে শহরের পথে মানুষ চেখে বেড়ানোর নেশাটুকু আবার চনমনিয়ে উঠল।  আমার শহর এক নতুন অভিসারে মাতছে, আমি কি আর নিজেকে ঘরের কোনে আটকে রাখতে পারি? বেরিয়েই পড়লাম ঝোলাটা কাঁধে নিয়ে, শহরের নবতম মাদকতার রস চাখতে। ঝোলাটা আঁতেলসুলভ নয়, নেহাতই অভ্যেস।

বাইপাস ধরে বাসটা যতই এগোতে থাকল, ততই টের পেতে লাগলাম সেই ছোটবেলার উত্তেজনা। বইমেলা, যে নামটা এক সময়ে আমার কাছে অন্ততঃ বাঙালির অন্যতম তীর্থক্ষেত্র। যেন দুর্গাপুজার পরেই বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব। সময় পাল্টেছে, জায়গা পাল্টেছে, কিন্তু উৎসাহে ভাঁটা পড়েনি। শুনেছি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ আন্তর্জাতিক বইমেলা হয় বার্লিন শহরে। কিন্ত কলকাতা বইমেলার মতো প্রাণপ্রাচুর্য, আমার ধারনা সেখানেও বিরল। একটা তথাকথিত কলোনিয়াল জাঙ্কইয়ার্ড, যে কতটা রঙ্গিন হতে পারে, তা যদি অনুভব করতে চাও, তাহলে বইমেলায় এসে দেখে যাও। একটা নাতিদীর্ঘ বাসযাত্রা শেষ করে, অবশেষে ভেতরে ঢুকলাম। ভেতরের দৃশ্য সবই প্রায় চেনাপরিচিত। মানুষের ঢল, ধুলোর চাদর, কলেজ পড়ুয়াদের জমায়েত, গীটার হাতে উঠতি গায়ক, চা কফির চিৎকার, ফিশফ্রাই, আইসক্রিম এর হাতছানি – আর সব কিছু ছাপিয়ে, নতুন বই এর গন্ধ। শরীরে একটা চনমনে ভাব এসে গেল। শুরু করলাম আমার বইমেলা অভিযান।

প্রথমেই চোখে পড়ল কয়েকটি অতিকায় প্যাভিলিয়ন। সেদিকেই পা বাড়ালাম। তখনো জানতাম না সেখানে কি চমক অপেক্ষা করে আছে। ঢুকেই চোখে পড়ল সারি সারি ছাদখোলা স্টল। কিন্তু সেগুলো প্রায় সবই প্রায় কোন না কোন টেকনিকাল কলেজের, বই এর বদলে সেখানে শোভা পাচ্ছে ল্যাপটপ, আর ক্যাটালগ এর জায়গায় ব্রোশিওর। বেশ অবাক লাগল। তবে কি ভুল করে অন্য কোন মেলায় ঢুকে পড়লাম? বেরিয়ে এলাম সেখান থেকে। সারি সারি মানুষের ভীড় এর মাঝখানে খানিকটা দিশেহারা লাগল। ভাবলাম প্রথমেই নতুনত্তের স্বাদ না  নিয়ে, প্রথমে চেনা পরিচিত পদ দিয়ে শুরু করাই ভাল। স্থির করে নিলাম আমার পরবর্তী গন্তব্য- শহর তথা রাজ্যের অন্যতম সেরা প্রকাশনা সংস্থার স্টল। সেই দিকেই পা বাড়ালাম। এক সময় খুঁজেও পেলাম। দেখলাম স্টল এর বাইরে বেশ লম্বা স্রোত। সেই স্রোতে গা ভাসিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়লাম । চারিদিকে বই, থরে থরে সাজানো। বই এর মাঝখান দিয়েই পথ। যেদিকেই তাকাই, চেনা নামের সারি। হাতে নিয়ে দেখ যতক্ষন খুশি। বেশ লাগছিল। হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম। কি আশ্চর্য! সবই তো চেনা নাম। নতুন বই কোথায়? নতুন লেখক কই ? বাঙালি কি তবে গত দশ বছরে বাংলা লিখতে ভুলে গেছে ? নাকি তারা সবাই ব্রাত্য? কয়েকটা বই এর খোঁজ করে হতাশ হলাম। বেরিয়ে এলাম সেখান থেকেও। বাইরে খোলা বাতাসে এসে হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। নিজের প্রাতিষ্ঠানিকতাকে মনে মনে ধিক্কার জানিয়ে, চললাম আমার পরবর্তী গন্তব্যের দিকে – লিটল ম্যাগাজিন।

বেশী খুঁজতে হল না। দেখলাম থিম প্যাভিলিয়ান এর পাশেই লিটল ম্যাগ প্যাভিলিয়ন। বইমেলা লিটলম্যাগকে ব্রাত্য হিসেবে এক কোনে ঠেলে দিয়েছে, এরকম একটা প্রচলিত ধারনা বরাবরই ছিল। এবার সেটা পাল্টেছে দেখে খুশি হলাম। সানন্দে এগিয়ে চললাম। দৃশ্যটা একইরকম, সেই সারবাঁধা টেবিল এ নানা বয়সের নানা পেশার মানুষ, তাদের নতুন পুরন সম্ভার নিয়ে বসে। ভাল লাগল। নিজের অল্প বয়েস টা মনে পড়ে গেল। পত্রিকা ছাপানোর নেশা যে কি সাংঘাতিক, সেটা মনে পড়ে গেল।

“আসুন দাদা, নিয়ে যান, মাত্র ২ টাকা – পড়লেই বুদ্ধিজিবী”, ডাক শুনে তাকিয়ে দেখি এক কলেজ পড়ুয়া তরুন, তার হাতে দেশলাই বাক্সের চেয়ে সামান্য বড় সাইজের একটি পত্রিকা।

আমি জন্ম রোম্যান্টিক মানুষ। গতানুগতিকএর বিপরীতে যাওয়া প্রতিটি পথ আমাকে বরাবরই আকর্ষন করেছে। কাজেই যখন দেখলাম, উঠতি প্রজন্মের এক যুবক, বহুজাতিকের স্বপ্ন না দেখে সাহিত্য নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে, আমার বেশ ভাল লাগল। মনে হল বাঙালি জাতটা বোধহয় এখনও স্বপ্ন দেখতে ভোলেনি। এগিয়ে গেলাম তার দিকে, ২ টাকা খরচ করে কিনেও ফেললাম সেই পত্রিকা।

এই সমস্ত চিন্তায় বুঁদ হয়ে ঘুরে চলেছি প্যাভিলিয়ন এর বিভিন্ন টেবিলে। অনেক নতুন মুখ, তাদের নতুন প্রচেষ্টা, বেশ লাগছিল দেখতে। বাংলা সাহিত্যের ভবিষ্যতের বীজ যে লিটল ম্যাগাজিনেই লুকিয়ে থাকে, সেটা মনে পড়ে গেল। কে বলতে পারে, এদের মধ্যেই হয়তো  লুকিয়ে আছে কোন ভবিষ্যতের সুনীল ও তার কৃত্তিবাসের দল ?

“এই যে দাদা, কি খবর ?” হঠাৎ বাঁধা পেয়ে চিন্তার জালটা ছিড়ে গেল। দেখি এক পরিচিত লব্ধপ্রতিষ্ঠিত (ওনার বই এর কাটতি অন্তত সেইরকমই বলছে) কবি আমাকে চিনতে পেরেছে। তার ভুবনমোহিনী হাসির স্রোতের সামনে আমার ততক্ষনে প্রায় ভেসে যাওয়ার জোগাড়।

সামান্য অবাক হলাম, ইনি তো প্রাতিষ্ঠানিক কবি। এনার কবিতার বই ঘটা করে ছাপার মত প্রতিষ্ঠানের অভাব নেই শহরে। এরকম একজন মানুষ লিটল ম্যাগ এর মত ক্ষুদ্র জায়গায় কেন ? উত্তরটাও হাতে নাতেই পেয়ে গেলাম ।

“এটা আমাদের পত্রিকার নতুন সংখ্যা”। একরকম জোর করেই হাতে গুজে দিলেন।

বাধ্য হয়েই সেটা খুলে দেখতে হল । বেশ রঙচঙ্গে, দামি কাগজে ছাপা, বিজ্ঞাপনে ঠাসা, তবে তার মাঝেমধ্যে ২-৪ টে কবিতাও ঠাঁই পেয়েছে। এককথায়, পত্রিকাটি বেশ ‘দৃষ্টিনন্দন’, কিন্তু ‘চিত্তাকর্ষক’ নয়। কোনরকমে বইখানা রেখে, সৌজন্যমূলক কথাবার্তা সেরে বেরিয়ে এলাম সেখান থেকে। বুঝলাম এবার নতুন গন্তব্য সন্ধানের সময় এসেছে।

ততক্ষনে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। মেলায় মানুষের ঢল বাড়ছে। ভাবলাম আমার পরবর্তী গন্তব্য নির্ধারনের ভার এদের ওপরেই ছেড়ে দেওয়া যাক। নিজেকে ভাসিয়ে দিলাম ভীড়ের স্রোতে, দেখিই না কোথায় গিয়ে নোঙ্গর করি। ভীড়ের গুতো খেয়ে, বেশ খানিকটা পথ উজিয়ে হাজির হলাম এক স্টলে। বেশ ভীড়, ভেতরে যে কি আকর্ষন আছে সেটা বাইরে থেকে দেখার উপায় নেই ভীড়ের ঠেলায়। কলকাতা মেট্রোয় সঞ্চয় করা যাবতীয় অভিজ্ঞতা উজার করে, ভীড় ঠেলে সামনে পৌছলাম। দেখি সামনে একটা মাঝারি মাপের মঞ্চ। তার ওপরে মাইক হাতে দুই যুবক যুবতী। তাদের জনমোহিনী আবেদনে বেশ কিছু মানুষ কাৎ। অনেক কষ্টে, যা বোধগম্য হল – এটি ‘মামার এফ এম’ নামক একটি জনপ্রিয় বেতার চ্যানেলের স্টল(বইমেলায় কেন, সে প্রশ্ন অবান্তর), আর সেখানে তখন চলছে একটি গেম শো। মাইক হাতে যারা অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করছেন তারা ওই চ্যানেলের ই ২ জন বিখ্যাত সঞ্চালক । আমার আশেপাশের জনতার মধ্যে অনুর্ধ্ব বাইশ-ই সংখ্যায় বেশী; দেখলাম তাদের কাছে এই দুই সঞ্চালকের জনপ্রিয়তা যে কোন চিত্রতারকা কেও কমপ্লেক্স দেবে। হংসমধ্যে বক হওয়াটা মেনে নিতে পারলাম না । নিজেকে বড্ড বেমানান মনে হতে লাগল। একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে বেরিয়ে এলাম।

ততক্ষনে বইমেলা দর্শনের সাধ প্রায় বার আনা মরে এসেছে। বিগত কয়েক ঘন্টায় যা কিছু দেখলাম (এক বাঙালির বই প্রেম ছাড়া, কারন ঐ একটি জিনিস অনেক খুঁজেও পাইনি) মনে হতে লাগল এক জীবনের অভিজ্ঞতা বোধহয় একদিনেই সঞ্চয় করে ফেলেছি। এসে দাঁড়ালাম মেলার ঠিক মাঝমাঝি খোলা মত জায়গাটায়। এখান থেকে চারপাশের একটা চমৎকার ভিউ পাওয়া গেল। প্রয়াগ এর তীর্থক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে ভারত দর্শনের মত সেখানে দাঁড়িয়ে পরলাম বইমেলা তথা বাঙ্গালী দর্শন করতে। চারদিক লোকে লোকারণ্য। তাদের মধ্যে বেশীরভাগই বেরোন’র পথ ধরছে। খাবারের দোকানের সামনে লম্বা লাইন থিম প্যাভিলিয়ন কেও হার মানাতে পারে। মেলার একেবারে শেষ প্রান্তে ঘর সাজানোর জিনিসের পসরা নিয়েও অনেকে বসেছে, দেখে মনে হল তাদের ও কুড়িয়ে বাড়িয়ে মন্দ উপার্জন হচ্ছে না।  মনে হল বইমেলা এতদিনে এক সার্থক ‘মিলনমেলায়’ পরিনত হতে পেরেছে- যেখানে বাঙ্গালী মেলার তুচ্ছ বিষয়বস্তু কে অগ্রাহ্য করে নানারকম আনন্দরসে নিজেকে মজিয়ে নিতে পেরেছে। হাতঘড়িতে দেখলাম প্রায় সাড়ে সাতটা। মনে পড়ল বাস ধরতে বেশ অনেকটা পথ হাঁটতে হবে। আমি ফেরবার পথ ধরলাম। একটা নতুন চিন্তা মাথায় এসে ভর করল – বইমেলার জন্য এবার নতুন একটা নাম ভাবতে হবে।

সেদিন রাতে আর ডায়েরির পাতাটা ভরতে পারিনি। শুধু এক লাইন লিখেছিলাম – আমি কূপমন্ডুকই ভালো।

Latest posts by কূপমন্ডুক (see all)