লাইন দিয়ে সার সার উদ্বাস্তু যখন পশ্চিমবঙ্গ নামক এক হেঁয়ালিতে প্রবেশ করছেন ঠিক তখনই নিঃশব্দে ভাগ হয়ে গেল বাঙালি। বাঙালি মুসলমানরা তখন বাঙালি রইলেন না, হয়ে গেলেন পাকিস্তানি। ধর্মের নামে এক অভূতপূর্ব দেশভাগ করে ইংরেজরা যখন বাঙালির মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়ে চলে গেল তখন কিছুই করার ছিল না কারও। একদিকে ভারতবর্ষে বাঙালিরা খুঁজে বেড়াচ্ছেন ঘর, উঠতে বসতে অপর বাঙালীদের থেকে দিন রাত লাঞ্ছনা গঞ্জনা শুনে এদেশে থাকা, কোথায় জায়গা দখল করে কোথাও উদ্বাস্তু কলোনি করে থাকা, ঠিক সেই সময়, পূর্ব পাকিস্তানে নতুন দেশের নামে শুরু হল এক অদ্ভুত ভাঁওতাবাজি। ভাষাগত দিক দিয়ে বাংলা ভাষার না ছিল কোন সম্মান, না ছিল কোন মর্যাদা। অন্যদিকে জাতিগত দিক দিয়ে বাঙালিদের ক্রীতদাস ছাড়া পশ্চিম পাকিস্তানিরা আর কিছু ভাবতে পারতেন না। স্বাধীনতার পর থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা বুঝে গেল, নামেই ইসলামের নামে দেশ ভাগ হয়েছে, আদতে মুখে উর্দু বলিয়ে পশ্চিম পাকিস্তান আসলে ইংরেজদের মতোই আরও একটা উপনিবেশ গড়ে তুলতে চায়। ছাইচাপা আগুন ছিলোই, সেটাই একসময় দাবানলে পরিণত হল। শুরু হল এক নতুন স্বাধীনতার লড়াই। মুক্তিযুদ্ধের লড়াই।

কিন্তু লড়াই হয়ে দাঁড়াল অসম লড়াই। এক সংগঠিত রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে অস্ত্রহীন, শক্তিহীন এক জাতির লড়াই। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে এসে পড়ল একের পর এক সেনাবাহিনী,হানা দিল গ্রামে গ্রামে, আর ঠিক এই সময়েই, এক সুবিধাবাদী শ্রেণির উত্থান হল। এরা উর্দুভাষী পাকিস্তানি নয়, বাংলাভাষী বাঙালি। এরা নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্যে পাকিস্তানিদের কাছে নিজের আত্মমর্যাদা বিক্রি করে যতরকম ভাবে সম্ভব মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করা শুরু করলেন। যত রকম নোংরা জঘন্য কাজ করা সম্ভব, তার কোনটাই এরা বাদ দিলেন না। হিন্দুদের ধর্ষণ, নির্বিচার হত্যা… অবশ্য হিন্দু শব্দটাই বা বলব কেন, এরা এদের নষ্ট কাজের জন্য হিন্দু মুসলিম কোনটাই দেখল না, এক জাতিকে দমনের উদ্দেশ্যে ঘর ঘর থেকে যুবতী মেয়ে টেনে নিয়ে যাওয়া, ধর্ষণ করা, খুনের পরে দেহের বিভিন্ন অংশ খুবলে খুবলে নিয়ে নিজেদের বিকৃত কাম চরিতার্থ এরা- এই সমস্ত কাজ করে যেত পাকিস্তানের বাহিনী এবং এই সকল কাজে পাকিস্তানিদের যারা সহায়তা করেছে তারাই রাজাকার। একসময় শুরু হল বুদ্ধিজীবী হত্যা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উজ্জল নক্ষত্রদের ঘর থেকে টেনে নিয়ে গিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে, একসময় পদ্মার জলে কতশত যে প্রতিভার লাশ ভেসে গেছে এই সকল পাকিস্তানী বাহিনী ও রাজাকারদের “সৌজন্যে” তার হিসেব নেই। বলা যেতে পারে, একটা জাতির মেরুদন্ড ভেঙে দিয়ে যাবার সবরকম চেষ্টা করেছিল এই সকল সাম্প্রদায়িক এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তি। একসময় স্বাধীনতা এল, তার বিস্তারিত ইতিহাস বর্ণনায় এই আলোচনা ভারাক্রান্ত করব না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান হলেন স্বাধীন বাংলাদেশের সর্বেসর্বা। কিন্তু সমস্যা কি মিটল? না।

কারণ এই সকল রাজাকারেরা কয়েকজন পশ্চিম পাকিস্তানে বা বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে পালালেও মূল সমস্যা মানে পাকিস্তান পন্থী মৌলবাদী শক্তি বাংলাদেশে কিন্তু টিকেই থাকল যারা মনে প্রাণে পাকিস্তানী কিন্তু উপায়ন্তর না দেখে এই দেশেই থাকতে হল।

চেষ্টা কিন্তু চলতেই থাকল দেশের স্থিতাবস্থা নষ্ট করে দেবার। এবং আরও বড় একটা সমস্যা তৈরি হল যখন মুজিবর রহমান দায়িত্বে এলেন। দেশের আইন শৃঙ্খলা ব্যবস্থা বলে কিছু ছিল না, মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহৃত বহু অস্ত্র সাধারন জনগণের কাছে থেকে গিয়েছিল যার ফলে সমস্যার পর সমস্যা তৈরি হল এবং মুজিবর রহমানও বিশেষ সুবিধা করে উঠতে পারল না।

সাধারণত মুসলিম দেশগুলিতে উদাহরণ স্বরূপ পাকিস্তান ইত্যাদির কথা বলা যেতেই পারে, সেনা অভ্যুত্থান এক অতি সাধারন ঘটনা। এই এক অদ্ভুত পরিস্থিতির মধ্যেই অকস্মাৎ এক বিকেলে ক্ষমতালোভী সেনাবাহিনী মুজিব ও তার পরিবারের সকলকে হত্যার মাধ্যমে এক নতুন অধ্যায়ের সুচনা করল বাংলাদেশে। এরপর থেকে যেটা দেখা গেল কখনো সেনা, কখনো মুজিব কন্যা শেখ হাসিনার আওয়ামি লীগ, কখনো জিয়াউর রহমান পত্নী খালেদা জিয়ার বি এন পি, কখনো আরেক মিলিটারি স্বৈরাচারী এরশাদ ক্ষমতায় এসেছেন।  সেই রাজাকারদের কিন্তু কেউ টিকিটি ছুতে পারেনি, উলটে জিয়াউর রহমান যিনি একসময় সেনা প্রধান ছিলেন এবং মাত্র ৪৩ বছর বয়সে রাষ্ট্রের হর্তা কর্তা হন, তিনি নিজের উদ্যোগে এক কুখ্যাত রাজাকার গোলাম আজমকে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে পুনরায় প্রবেশের ব্যবস্থা করে দেন। আদতে জিয়াউর রহমান সেই সেনার প্রতিনিধি করেছিলেন যারা মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের হয়ে লড়া সত্ত্বেও দেশের গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোকে হেয় করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেননি উল্টে রাজাকার গোষ্ঠী এবং মুসলিম মৌলবাদী সংগঠন জামাতকে পরোক্ষে দেশে পাখনা মেলার সুযোগ করে দিয়ে গিয়েছিলেন, তার মৃত্যুর পর উপমহাদেশের রাজনীতির নিয়মেই তার পত্নী খালেদা জিয়া (বিবাহপূর্ব নাম খালেদা মজুমদার) বি এন পির সর্বোচ্চ পদে আসীন হন।

ইতিহাসের নিরপেক্ষ দৃষ্টি বলে মুজিব কিংবা জিয়াউর রহমান এঁরা কেউই ক্ষমতায় আসার পর অকস্মাৎ ক্ষমতা পেয়ে দেশের ভাল করার পরিবর্তে বিভিন্ন রকম সমস্যা দিয়ে, বাংলাদেশের বাঙালিদের আরও হতাশায় নিমজ্জিত হন।

রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি বলে, খালেদা জিয়া পদে থাকাকালীন জামাত তথা মৌলবাদীদের এমন প্রশ্রয় দেন, এবং বাংলাদেশের মাটিকে ভারতবিরোধী সমস্ত কাজের আখড়ায় পরিণত করেন। আদতে ভারতবর্ষ যে বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধে সাহায্য করেছিল দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, সেই ইতিহাস এই দলটি যথাসাধ্য মোছার চেষ্টা করেছে। ভারতের কাছে বি এন পি ক্ষমতায় থাকা চিরকালই এক বিপজ্জনক ব্যাপার হয়ে এসেছে। অন্যদিকে আওয়ামি লীগ ক্ষমতায় এলে বাংলাদেশীদের কাছে বিরাট কোন লাভ না হলেও অন্তত কিছুটা হলেও নিরাপত্তাগত দিক থেকে ভারত একটু ভাল জায়গায় যেতে পারে।

আসলে মৌলবাদী আখড়া সব জায়গায় সব দেশেই সমান, আর এস এস যেমন ভারতবর্ষে দেশ জাতি গঠনের নামে পিটি ইত্যাদি করে আসলে হিন্দু মৌলবাদী ও মগজধোলাইয়ের কেন্দ্র গড়ে তুলছে একই ভাবে এই জামাত ই ইসলামি কিংবা লস্কর ই তইবা, কিংবা তালিবান কিংবা আল কায়দা এরা ইসলামের জিগির তুলে আদতে তাদের সংকীর্ণ স্বার্থ সিদ্ধি করতে চায়।

সাম্প্রতিক কালে আওয়ামি লীগ ক্ষমতায় এল এবং বিপুল ভোটে জিতে। ভোটের সময় তাদের বিভিন্ন প্রতিশ্রুতির মধ্যে একটি ছিল রাজাকারদের শাস্তি দেওয়া। আদতে খুঁজে পেতে দেখলে দেখা যাবে, গোটা দেশে ৫ থেকে ৭ শতাংশ এই সব মুসলিম মৌলবাদের কবলে পড়ে আছে, কিন্তু সমস্যা হল উপমহাদেশ। যে উপমহাদেশে চিরকাল ধর্মই শেষ কথা বলে, শিক্ষার থেকে ধর্মই চালিকাশক্তি হয় দেশের, এবং মূল সমস্যা অশিক্ষা সেখান থেকে ভাল কিছু আশা করা সম্ভব নয়।

ঠিক এই সময়েই রাজাকারদের বিচার শুরু হল বাংলাদেশে এবং যখনই এক রাজাকারের বিচারে ফাঁসির পরিবর্তে যাবজ্জীবন ঘোষণা হল ঠিক তখনই গর্জে উঠল মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ানো, ধর্মীয়  কুসংস্কারের  বন্ধন থেকে মুক্ত বাঙালি সমাজ। শাহবাগে শুরু হল এক জাতীয়তাবাদী অরাজনৈতিক বিক্ষোভ যার মূল দাবীই হয়ে উঠল একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে যারা দেশবাসীর বিপক্ষে গিয়ে দেশের চরম ক্ষতিসাধন করেছিলেন তাদের ফাঁসি। একসময় দাবী উঠল জামাত নিষিদ্ধ করার। এবং সাম্প্রতিক কালের সমস্ত রকম বিক্ষোভ ছাপিয়ে প্রতিবাদের এক নতুন দিগন্ত খুলে দিল শাহবাগ।

এবং ঠিক এইসময়েই তাদের রঙ চিনিয়ে দিল বি এন পি, দেশের এই জন জাগরণের সময়ে জামাতের হাত ধরে। বুদ্ধিজীবী ধর্মনিরপেক্ষ জাগ্রত জনতাকে “নাস্তিক” আখ্যা দিয়ে ইসলাম ও নাস্তিকের যুদ্ধ আখ্যা দিয়ে এই আন্দোলনের নামে নানারকম কুৎসা ছড়ানো শুরু করল জামাত তথা বি এন পি। এক রাজাকার সাঈদির ফাঁসির রায়ে এই মৌলবাদীরা হয়ে উঠল অতিরিক্ত সক্রিয় এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে যতভাবে সম্ভব ঝামেলা পাকানো শুরু করে দিল।

বাংলাদেশের লড়াই তাই এখন মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে, যে লড়াই লড়তে ভারতবর্ষ এখনও পিছিয়ে রয়েছে কয়েক লক্ষ যোজন, যে ভারতবর্ষে এখনও জাত পাতের নামে, মতুয়ার নামে, ইসলামের নামে নির্লজ্জ সংখ্যালঘু তোষণ হয়। তাই বাঙালিরা এখানেও ভারতবর্ষকে হারিয়ে দিল, এবং মনে করিয়ে দিয়ে গেল গোপালকৃষ্ণ গোখেলের সেই অমোঘ বাণী “what Bengal thinks today, India thinks tomorrow”.

লড়াই চলুক, বলাই বাহুল্য আমার রায় কোন দিকে…

Latest posts by অভীক দত্ত (see all)